নিঃশব্দ মাটির নিচে আমার বাবা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প।এপ্রিল ১৮, ২০২৬
কবরে শোয়ানো হচ্ছে আমার বাবাকে।
আমি স্থির হয়ে অপলক তাকিয়ে আছি কবরের গর্তের দিকে। চারপাশে মানুষের ভিড়, নড়াচড়া, কিছু চাপা কান্না—সব মিলিয়ে একটা শব্দহীন শব্দ তৈরি হয়েছে, যেটা কেবল মাথার ভেতরেই বাজছে।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে আছি আমি।
এই শব্দটা এখন শুধু শব্দ না, আমার পুরো অবস্থাটা।
গোলমেলে লাগছে পুরো পরিস্থিতিটাকে।
বুঝে উঠতে পারছি না কী করবো, কোথায় তাকাবো, কীভাবে দাঁড়াবো।
আমার মনে হচ্ছে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু একই সাথে মনে হচ্ছে আমি এখানে নেই। যেন শরীরটা জায়গায় আছে, আর আমি কোথাও একটু দূরে সরে গেছি—এই ঘটনার বাইরে, এই সময়ের বাইরে।
পৃথক হয়ে গেছি আমি এই সবের থেকে।
এটা এক অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা। আগে কখনও হয়নি এমন অনুভূতি। চারপাশে যা ঘটছে, তার সাথে আমার ভেতরের কোনো সংযোগ খুঁজে পাচ্ছি না।
মনে হতে লাগলো, হয়তো ঘুমের মাঝের কোনো বাজে স্বপ্ন দেখছি।
যে স্বপ্নটা খুব দ্রুত ভেঙে যাবে। আমি উঠে বসব, পানি খাব, আর সবকিছু ভুলে যাব।
কিন্তু ঘুম ভাঙছে না।
বরং সময়টা আরও ভারী হয়ে যাচ্ছে।
আজ কেন যেন মনে পড়ছে,
একদিন এই কবরের রাস্তার পাশ দিয়েই বাবা আর আমরা হাঁটতাম।
পাকা সড়ক ধরে বাড়ি ফিরতাম।
সেই সময় হাঁটা মানে ছিল সাধারণ একটা কাজ। কোনো ভার ছিল না। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান, দূরে গাছের ছায়া, আর বাবার ধীর অথচ নিশ্চিত পদক্ষেপ। আমরা তার পাশে হাঁটতাম, কখনো এগিয়ে যেতাম, কখনো পিছিয়ে পড়তাম।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা আগামী দিনের সুন্দর একটা স্বপ্নের কথা বলতাম।
বাবা বলতেন, “একদিন সব সহজ হবে।”
আমরা বিশ্বাস করতাম।
আমাদের চোখে ছিল আগামীর আলোর মতো স্বপ্ন।
যে স্বপ্ন এখন মনে হচ্ছে অন্য কারও জীবনের অংশ ছিল। আমার না।
কেন জানি না আজ সেই কথাগুলোই বড্ড বেশি মনে পড়ছে।
আর মনে পড়ছে, বাবার হাঁটার শব্দটা।
তার জুতো মাটিতে লাগার একটা নির্দিষ্ট শব্দ ছিল। সেই শব্দটা এখন এই নীরবতার মধ্যে হারিয়ে গেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বাজছে।
এখন এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে—সে সব স্মৃতি যেন অর্থহীন।
মনে হচ্ছে এই ঘটনাটি মিথ্যে।
ঘটনাগুলো আদৌ কখনও ঘটেনি এই পৃথিবীতে।
শুধু একটা দৃশ্য চলছে, আর আমি সেটা দেখছি বাইরে থেকে।
আর আমি দাঁড়িয়েই আছি,
কেমন যেন অস্পষ্ট লাগছে পুরো পরিস্থিতিটা।
বাবার শবদেহ সাদা কাফনে মোড়া।
তিনি এখন আর সেই মানুষ না, যিনি কথা বলতেন, হাঁটতেন, রাগ করতেন। এখন তিনি শুধু একটি নীরব উপস্থিতি।
কবরে শোয়ানো হচ্ছে,
মাটির আচ্ছাদনে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে ধীরে ধীরে।
প্রথমে পা, তারপর বুক, তারপর মুখ—সব একে একে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির নিচে।
এ যেন শবদেহকে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে না,
ঢেকে দেওয়া হচ্ছে আমার সমস্ত ভালোবাসার স্মৃতিকে।
প্রতিটি মাটির স্তর নামার সাথে সাথে মনে হচ্ছে, আমার ভেতরের কোনো একটা অংশও চাপা পড়ে যাচ্ছে।
আমি বুঝতে পারছি না এটা শোক নাকি শূন্যতা।
নাকি দুটোই একসাথে।
চারপাশে মানুষ কমে আসছে। কেউ কেউ চলে যাচ্ছে, কেউ শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
আর আমি থেকে যাচ্ছি।
সব শেষে সবাই চলে গেলো।
মাটি এখন স্থির।
যেখানে একটু আগে বাবার উপস্থিতি ছিল, সেখানে এখন শুধু একটা নামহীন জায়গা।
বসে থাকলাম আমি আর মাটির গভীরে আমার বাবা।
সময় কেটে যাচ্ছে কি যাচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে—এই জায়গাটা আর পৃথিবীর অংশ না। এটা যেন একটা থেমে যাওয়া মুহূর্ত, যেটা আর কখনও এগোবে না।
আমি জানি না এখন আমি কীভাবে উঠব, কীভাবে ফিরব।
শুধু বসে আছি।
আর মনে হচ্ছে, এই মাটির নিচে কোথাও এখনো বাবার নিঃশ্বাসের শেষ শব্দটা আটকে আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।