শেষ দেখা হয়নি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ৩১ অক্টোবর ২০২৬
বাবার ফোনটা এসেছিল সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে। রাশেদ তখন অফিসে বসে সহকর্মীর সঙ্গে তর্ক করছিল। ফোনটা কেটে দিয়ে সে আবার কাজে মন দিয়েছিল।
কিছুক্ষণ পর বাবার নম্বর থেকে আবার ফোন এল। এবারও ধরতে ইচ্ছে করছিল না। তবু ফোনটা ধরল।
ওপাশ থেকে ছোট বোনের গলা শোনা গেল।
‘ভাইয়া, তুমি কোথায়? বাবা আর নেই।’
রাশেদ চেয়ারে বসেই রইল। টেবিলের ওপর খোলা ফাইল, পাশে আধখাওয়া চা। সহকর্মী কী একটা বলছিল, সে শুনতে পেল না।
শুধু বলল, ‘সকালে তো কথা হলো!’
বোন কিছু বলল না। ফোনের ওপাশে কান্নার শব্দ শোনা গেল।
সকালে বাবা বলেছিলেন, ‘বাবা, সময় পেলে একবার বাড়িতে আসিস। তোর সঙ্গে কিছু কথা ছিল।’
রাশেদ তখন কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রেখে বলেছিল, ‘এখন সম্ভব না বাবা। সপ্তাহ শেষে আসব।’
‘আচ্ছা, কাজ কর।’
বাবা ফোন রেখে দিয়েছিলেন।
বাড়িতে পৌঁছে রাশেদ উঠানে লোকজনের ভিড় দেখল। ঘরের ভেতর থেকে আগরবাতির গন্ধ আসছিল। সাদা কাপড়ে ঢাকা বাবার শরীরটা মেঝেতে রাখা। মা মাথার কাছে বসে আছেন। তাঁর আঁচল এক পাশে সরে গেছে, সেদিকে খেয়াল নেই।
রাশেদ বাবার মুখের কাপড়টা সরাল।
চেনা মুখ। বন্ধ চোখ। কপালের পাশে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। মনে হলো, কেউ একটু হাত বুলিয়ে দিলেই চুলগুলো ঠিক হয়ে যাবে।
সে বাবার হাত ধরল। হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আছে।
পেছন থেকে একজন বলল, ‘রাশেদ, একটু সরে দাঁড়াও। লোকজন আসবে।’
রাশেদ হাতটা ছেড়ে দিল।
বাবাকে কবর দিয়ে বাড়ি ফেরার পর আত্মীয়স্বজনের কেউ চা খাচ্ছিলেন, কেউ নিচু গলায় কথা বলছিলেন। রাশেদ সবার পাশ কাটিয়ে বাবার ঘরে ঢুকল।
বিছানার চাদরটা টানটান করে পাতা। বালিশের পাশে চশমা। টেবিলে ওষুধের বাক্স, পানির গ্লাস আর পুরোনো মোবাইল ফোন।
সে ফোনটা হাতে নিল। কলের তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পেল। শেষ কলের সময় সকাল ৯টা ১৭ মিনিট।
রাশেদ পর্দাটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিল।
ড্রয়ারের ভেতর কাগজপত্র খুঁজতে গিয়ে একটা খাম পেল। খামের ওপর তার নাম লেখা। বাবার হাতের লেখা—কিছুটা কাঁপা, তবু অক্ষরগুলো চেনা।
ভেতরে ছোট্ট একটা চিঠি।
‘রাশেদ,
তোর সঙ্গে কিছু কথা ছিল। তুই ছোট থাকতে অনেক কথা বলতিস। এখন তোকে ফোন করলেও তাড়াহুড়ো থাকে। ভাবলাম, সামনে বসে গল্প করব। তোর ছোটবেলার একটা ছবি পেয়েছি, সেটা দেখাব।
সময় হলে আসিস।
—বাবা।’
চিঠির নিচে কোনো তারিখ ছিল না।
রাশেদ খামটা বিছানার ওপর রাখল। ড্রয়ারের ভেতর আরও কিছু কাগজ ছিল। ওষুধের দোকানের বিল, ডাক্তারের পরামর্শ, কয়েকটা পরীক্ষার রিপোর্ট। একটা বিলের পেছনে বাবার হাতের লেখায় একটা তারিখের পাশে লেখা—‘রাশেদ আসবে।’
তারিখটা তিন মাস আগের।
সেদিনও সে বাড়ি যেতে পারেনি। অফিসে কাজ ছিল। বাবাকে বলেছিল, পরের সপ্তাহে আসবে।
রাশেদ কাগজটা উল্টে আবার দেখল। তারিখের পাশে আর কিছু লেখা নেই।
মা দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
‘কী খুঁজছিস?’
‘কিছু না, মা।’
মা টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোর বাবা কয়েক দিন ধরে চশমাটা খুঁজছিল।’
রাশেদ চিঠিটা ভাঁজ করতে গিয়ে থেমে গেল।
‘ছবিটা কোথায়, মা?’
মা বিছানার নিচে রাখা একটা পুরোনো অ্যালবাম বের করে দিলেন। অ্যালবামের মলাটে ধুলো জমেছে। পাতা উল্টাতে উল্টাতে রাশেদ একটা ছবি পেল। স্কুলের পোশাক পরা ছোট্ট সে, পাশে বাবা। বাবার এক হাত তার কাঁধে, অন্য হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল।
ছবির পেছনে লেখা, ‘রাশেদের প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন।’
ছবিটা কতবার দেখেছে সে, মনে করতে পারল না।
মা অ্যালবামটা নিয়ে বিছানার এক পাশে বসে রইলেন। রাশেদ কিছু বলতে চেয়েও বলল না। ঘরের বাইরে থালাবাসনের শব্দ হচ্ছিল। কেউ একজন মাকে ডাকল। মা উঠতে গিয়ে আবার ফিরে তাকালেন।
‘খাবি কিছু?’
রাশেদ মাথা নাড়ল।
মা চলে যাওয়ার পর সে ছবিটা চিঠির ভেতর রেখে দিল। খামটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখল, এক পাশের আঠা শুকিয়ে গেছে। চাপ দিয়েও লাগল না।
রাতে বাড়ির লোকজন চলে গেলে ঘরটা আরও ফাঁকা হয়ে গেল। পাশের ঘরে মা শুয়ে আছেন। মাঝে মাঝে তাঁর কাশির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
রাশেদ বাবার বিছানায় বসে টেবিলের জিনিসগুলো দেখতে লাগল। চশমাটা যেখানে ছিল, সেখানেই পড়ে আছে। এক কাঁচের কোণে ছোট একটা দাগ।
সে চশমাটা হাতে নিল। কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে দেখল, তারপর চোখে দিল।
ঘরের দেয়াল, টেবিল, দরজার পাশের ক্যালেন্ডার—সব ঝাপসা লাগছিল।
রাশেদ চশমাটা খুলে কাঁচটা জামার কোণা দিয়ে মুছল। আবার চোখে দিল। তবু ঝাপসা।
বাইরে তখন শেষ রাতের বাতাসে জানালার পর্দাটা একটু একটু নড়ছিল।
রাশেদ চশমাটা টেবিলের ওপর আগের জায়গায় রেখে দিল। পাশে বাবার মোবাইল ফোন। পর্দা কালো হয়ে আছে।
সে চিঠিটা ভাঁজ করে ড্রয়ারে রাখল। খামটা আর বন্ধ করল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।