শেষ এক বছর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সেদিন রাতে রাশেদের ঘুম আসছিল না।
ঘড়িতে রাত ২টা ১৭ মিনিট।
পাশে মায়া গভীর ঘুমে। জানালার ফাঁক দিয়ে রাস্তার হলুদ আলো এসে তার মুখের এক পাশ ছুঁয়ে আছে। বাইরে মাঝে মাঝে গাড়ি যাচ্ছে। হেডলাইট এসে দেয়ালে একটু আলো ফেলছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
রাশেদ মোবাইলটা হাতে নিল।
কাজের মেইল। তিনটা মেসেজ। ব্যাংকের নোটিফিকেশন। ফেসবুকে কারও জন্মদিন।
সবকিছু স্বাভাবিক।
শুধু সে স্বাভাবিক নেই।
সন্ধ্যায় ডাক্তার বলেছিলেন, “এখনই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আরও কিছু পরীক্ষা করতে হবে।”
স্বাভাবিক গলায় বলা কথা।
তবু রাশেদের কানে আটকে ছিল একটা শব্দ।
যদি।
ডাক্তার কোনো সময়সীমা দেননি। কোনো খারাপ খবরও নিশ্চিত করে বলেননি। শুধু আরও কিছু পরীক্ষা করতে বলেছেন।
কিন্তু মানুষকে মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কখনো কখনো কোনো নিশ্চিত খবরের প্রয়োজন হয় না।
রাশেদ মোবাইলটা বন্ধ করে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ তার মনে হলো—
যদি সত্যিই আর এক বছর থাকে?
এক বছর।
বারো মাস।
তিনশো পঁয়ষট্টি দিন।
হিসাবটা করতে গিয়ে সে নিজেই থেমে গেল।
এত কম?
তারপর প্রথমবার মনে হলো, এতদিন সে জীবনকে বছর দিয়ে মাপেনি। মেপেছে বেতন দিয়ে, পদোন্নতি দিয়ে, ঋণের কিস্তি দিয়ে, ছেলের পরীক্ষার ফল দিয়ে, ছুটির দিনের সংখ্যা দিয়ে।
কিন্তু যদি সময় সত্যিই কমে আসে?
তাহলে কী থাকবে?
রাশেদের প্রথমেই অফিসের কথা মনে পড়ল।
আট বছর ধরে একই চাকরি। পদোন্নতির জন্য কত রাত অফিসে বসে থেকেছে। কত ছুটির দিনে ল্যাপটপ খুলেছে। মায়া কতবার বলেছে, “আজ একটু বাইরে যাবে?”
সে বলেছে, “আজ না। কাজ আছে।”
একদিন রিদয় স্কুল থেকে ফিরে বলেছিল, “বাবা, তুমি কি আমার সঙ্গে একটা দিন পুরো কাটাতে পারবে?”
রাশেদ তখন কম্পিউটারে চোখ রেখে বলেছিল, “অবশ্যই পারব। এই সপ্তাহটা যেতে দাও।”
সেই সপ্তাহ আর আসেনি।
রিদয়ের বয়স এখন পনেরো।
রাশেদ হঠাৎ বুঝতে পারল, ছেলেটার সঙ্গে শেষ কবে দুপুরে বসে ভাত খেয়েছে, সে মনে করতে পারছে না।
এই কথাটা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ লাগল।
তারপর সুমনের কথা মনে হলো।
ছোট ভাই।
তিন বছর ধরে কথা নেই।
জমিজমার একটা ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। সুমন এমন একটা কথা বলেছিল, যা রাশেদ ভুলতে পারেনি।
সেও একটা কথা বলেছিল।
তারপর দুজনেই অপেক্ষা করেছে।
কে আগে ফোন করবে?
কেউ করেনি।
তিন বছর।
রাশেদ মোবাইলটা আবার হাতে নিল।
সুমনের নাম খুঁজে বের করল।
আঙুলটা কলের ওপর রেখে অনেকক্ষণ বসে রইল।
এত রাতে ফোন করলে কী বলবে?
“কেমন আছিস?”
তারপর?
পুরোনো রাগ কি এক ফোনে মুছে যাবে?
হয়তো না।
তবু কল করল।
দুইবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো গলা এল—
“হ্যালো?”
রাশেদ কিছু বলল না।
“হ্যালো? কে?”
“আমি।”
কয়েক সেকেন্ড চুপ।
তারপর সুমন বলল, “রাশেদ?”
“হ্যাঁ।”
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“এত রাতে ফোন করেছিস?”
রাশেদ জানালার দিকে তাকাল।
“তোকে অনেক দিন ফোন দিই না।”
ওপাশে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই।
তারপর সুমন খুব আস্তে বলল,
“আমিও তো দিইনি।”
এইটুকুই।
কেউ কাউকে ক্ষমা চাইল না।
পুরোনো জমির কথাও উঠল না।
শুধু দুজন মানুষ তিন বছর পর আবার কথা বলল।
ফোন রাখার আগে সুমন বলল, “কাল কথা বলবি?”
রাশেদ বলল, “হ্যাঁ।”
ফোনটা রেখে সে কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে রইল।
বুকের ভেতরটা একটু হালকা লাগছিল।
পরদিন অফিসে গিয়ে নিজের ডেস্কটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল সে।
একই কম্পিউটার।
একই ফাইল।
একই চেয়ার।
একই দেয়ালে গত বছরের ক্যালেন্ডার।
সকাল সাড়ে দশটায় বস এসে বললেন, “রাশেদ, আগামী মাস থেকে নতুন একটা দায়িত্ব নিতে হবে। কাজটা একটু বেশি। তবে ভবিষ্যতে তোমার জন্য ভালো হবে।”
রাশেদ চুপ করে রইল।
বস বললেন, “কী হলো?”
“স্যার, একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“আমি আগের কাজটাই ঠিকমতো করতে চাই। নতুন দায়িত্বটা এখন নিতে পারব না।”
বস কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“তুমি তো এতদিন ধরে এই সুযোগটার জন্য অপেক্ষা করছিলে।”
রাশেদ হালকা হাসল।
“হয়তো তখন অপেক্ষা করতাম।”
“এখন?”
রাশেদ উত্তর দিল না।
নিজের কথাতেই সে অবাক হয়েছিল।
বছরের পর বছর যে জিনিসটাকে সাফল্য ভেবেছে, আজ সেটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো—সবকিছু পাওয়া আর সবকিছু বাঁচা এক কথা নয়।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে রিদয়কে বলল,
“চল, হাঁটতে যাই।”
রিদয় বই থেকে মুখ তুলল।
“এখন?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”
“জানি না।”
“তাহলে হাঁটতে যাব কেন?”
রাশেদ হেসে বলল, “সেটা গিয়ে ঠিক করব।”
দুজন বেরিয়ে পড়ল।
রাস্তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে রিদয় স্কুলের গল্প করল। এক বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। আগামী বছর কী পড়বে, সেটা নিয়ে চিন্তা করছে। তারপর অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে একটা মেয়ের কথা বলল।
রাশেদ শুনছিল।
মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছিল।
একসময় রিদয় থেমে বলল,
“বাবা?”
“হুম?”
“তুমি আজ এত চুপ কেন?”
“তোর কথা শুনছি।”
রিদয় একটু হেসে বলল,
“তুমি আগে কখনো এত মন দিয়ে শোনোনি।”
রাশেদ ছেলের দিকে তাকাল।
কথাটা মজা করে বলা।
তবু কোথায় যেন গিয়ে লাগল।
ফিরে আসার সময় রিদয় বলল, “কালও যাব?”
রাশেদ বলল, “যাব।”
তারপর একটু থেমে যোগ করল,
“তুই চাইলে।”
সেদিন রাতে মায়া ঘুমিয়ে যাওয়ার পর রাশেদ অনেকক্ষণ তার পাশে বসে থাকল।
মায়ার চুলের কয়েকটা গোছা কপালের ওপর এসে পড়েছে।
সে হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দিতে গিয়েও থেমে গেল।
এত বছর পাশাপাশি থেকেও মানুষটার মুখটা সে কতদিন এমন করে দেখেনি?
মায়া ঘুমের মধ্যে একটু নড়ল।
“ঘুমাওনি?”
রাশেদ চমকে গেল।
“না।”
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
মায়া চোখ না খুলেই বলল,
“তোমার ‘কিছু না’ গলাটা আমি চিনি।”
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“মায়া।”
“হুম?”
“আমরা কি অনেক কিছু পরে করব বলে রেখে দিয়েছি?”
মায়া এবার চোখ খুলল।
কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“সবাই রাখে।”
“আমরা?”
“আমরাও।”
রাশেদ আর কিছু বলল না।
মায়া তার হাতটা ধরে বলল,
“আগে ঘুমাও। কাল অফিস আছে।”
রাশেদ মৃদু হেসে বলল,
“কাল অফিসে একটু দেরি হলেও হবে।”
মায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
পরদিন সকালে রাশেদ একটা পুরোনো খাতা বের করল।
অনেকদিন ব্যবহার করা হয়নি।
প্রথম পাতায় লিখল—
যদি আমার হাতে আর এক বছর থাকে।
তার নিচে লিখতে গিয়ে কলম থেমে গেল।
সে অনেক কিছু লিখতে পারত।
বিদেশে যাবে।
বড় গাড়ি কিনবে।
বাড়ি বদলাবে।
ব্যাংকের টাকা গুছিয়ে রাখবে।
কিন্তু কিছুই লিখল না।
শুধু লিখল—
রিদয়ের সঙ্গে একটা পুরো দিন।
সুমনের সঙ্গে দেখা।
মায়ার সঙ্গে কোথাও যাওয়া—যেখানে কোনো কাজ থাকবে না।
মাকে ফোন করা।
আর এমন কিছু কাজ করা, যেগুলো করতে ইচ্ছে হয়েছিল কিন্তু সময়ের অজুহাতে করা হয়নি।
শেষে অনেকক্ষণ ভেবে একটা লাইন লিখল—
সবাইকে খুশি করার চেষ্টা বন্ধ।
খাতাটা বন্ধ করে সে কিছুক্ষণ হাতের ওপর রেখে বসে থাকল।
এক বছর পরে কী হবে, সে জানে না।
পরীক্ষার রিপোর্ট কী বলবে, সেটাও জানে না।
হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
হয়তো সামনে দীর্ঘ চিকিৎসা।
হয়তো সত্যিই সময় কম।
কিন্তু সেদিন একটা জিনিস সে বুঝেছিল।
মৃত্যুর কথা মনে রাখা মানে প্রতিদিন মৃত্যুর অপেক্ষা করা নয়।
কখনো কখনো তার মানে হলো—কোন জিনিসগুলো সত্যিই বাঁচিয়ে রাখার মতো, সেটা নতুন করে চিনে নেওয়া।
সেদিন রাতে রাশেদ ঘুমানোর আগে জানালাটা খুলে দিল।
শহর তখনও জেগে আছে।
কেউ অফিস থেকে ফিরছে।
কেউ দোকানের শাটার নামাচ্ছে।
রাস্তার ওপাশে একজন ফোনে কারও সঙ্গে ঝগড়া করছে।
একটা বাস চলে গেল।
তারপর আবার শব্দ কমে এল।
কেউ জানে না তার হাতে কতদিন।
রাশেদও জানে না।
সে শুধু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ শহরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল—
“যতদিন আছে, এবার একটু সত্যি করে বাঁচি।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।