পথটা দেখায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০৬, ২০২৬
দিন অভিক
হাসপাতালের ঘরটা নতুন না—সাদা দেয়াল, ধীরে ঘোরা ফ্যান, এক কোণে স্যালাইনের বোতল। তবু জানালাটা অন্যরকম—খোলা, কিন্তু যেন পুরোটা খোলা না। বাইরে আকাশটা ভেতরে এসে থেমে গেছে, বেরোতে ভুলে গেছে।
বিছানার পাশে টেবিল। লাল মলাটের ডায়েরি।
ভেতরে কোনো গল্প নেই, কোনো স্মৃতি নেই—শুধু হিসাব।
“চাল ২ কেজি”
“ডাল ১ কেজি”
“তেল ৫০০ গ্রাম”
শেষ পাতায় এসে লেখা থেমে গেছে—“আজ—”
এরপর কলম আর এগোয়নি।
সে তাকায়। হাত বাড়ায় না—যেন ছুঁলেই বাকি জীবনটা নড়ে উঠবে।
সময় এখানে ঠিক চলে না। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, কিন্তু তার ভেতরে কিছু জমা হয় না। মাঝে মাঝে মনে হয়—সময় না, শুধু অভ্যাস চলছে।
ডাক্তাররা যা বলার বলে গেছে। শরীর আর আগের মতো থাকবে না।
সে মাথা নাড়ে না, আবার সম্মতিও দেয় না।
ভেতরে কোথাও শুধু একটা ভাবনা—এটা কি শেষ, নাকি শেষের অনুশীলন।
বিকেলের রোদ জানালা দিয়ে ঢোকে।
চাদরের ভাঁজে আটকে যায়, বেরোতে পারে না।
হঠাৎ মনে হয়—আলোটা যেন কারও হাত, কিন্তু ধরার মতো শক্ত নয়।
তার মাথায় আসে—আজকের বিকেলটা আলাদা।
কোনো ঘটনার কারণে না।
বরং কোনো কিছু ঘটছে না বলেই।
একসময় এই সময়েই সে দোকান গুটাতো।
টাকা গুনতে গুনতে আঙুলে তেলের গন্ধ লেগে থাকত।
শেষে দরজাটা টেনে দিত ধীরে—যেন দিনটা পুরোপুরি শেষ না হয়।
দরজা খোলে।
ছেলে ঢোকে। একটু দেরি হয়েছে। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু বলার চেষ্টা আছে।
“তোমার জন্য সিঙ্গারা এনেছিলাম… গরম ছিল না।”
সে তাকায়।
“গরম-ঠান্ডা এখন আলাদা কিছু না। রেখে দাও।”
প্যাকেটটা ডায়েরির পাশে রাখা হয়।
হিসাবের পাশে এখন ঠান্ডা খাবার—যা খাওয়ার জন্য না, থাকার জন্য রাখা।
“আজ কেমন লাগছে?”
ছেলে বলতে চায়—সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু বাক্যটা মাঝপথে আটকে যায়।
নিজের গলায়ও সেটা অপরিচিত শোনায়।
সে একটু সময় নেয়।
“মনে হচ্ছে… সব গুছিয়ে আসছে,” সে বলে।
“যেমন দোকান বন্ধ করার আগে শেষবার হিসাবটা দেখা হয়—যদিও কিছুটা ভুল থেকেই যায়।”
গোধূলি ঘন হয়।
আলো আর অন্ধকার একে অন্যকে ছাড়তে চায় না।
“দেখছো?” সে বলে।
“গাছগুলো একটু কাছে এসেছে।”
ছেলে তাকায়। গাছ আগের জায়গাতেই আছে।
তবু সে কিছু বলে না।
ছেলে তার হাত ধরে। এবার কোনো কথা নেই।
নিঃশ্বাস ধীরে আসে।
একটা সময় ধরে শুধু শ্বাসই বাকি থাকে।
সে হঠাৎ ভাবে—
যাবার সময় গোধূলিটা কেমন হবে?
সব কি এমনই ধীরে নামবে,
নাকি হঠাৎ করে সব আলো একসাথে ছেড়ে দেবে?
তার মনে পড়ে নিশি।
নিশি বলেছিল,
“তুমি গেলে আমি আটকাবো।”
সে তখন হেসেছিল।
এখন সেই হাসিটা আর কোথাও নেই—শুধু একটা পুরোনো শব্দের মতো ভেসে থাকে।
দূরে জানালা কাঁপে।
বাতাস ঢোকে।
চুলে লাগে।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়—
বাতাসও যেন তাকে থামাতে চাইছে।
কিন্তু বাতাস শুধু ছুঁয়ে যায়।
থামাতে পারে না।
সে ধীরে বলে—
“গোধূলি তো এমনই।
থামায় না কাউকে… শুধু পথটা দেখায়।”
হঠাৎ সে বলে,
“সিঙ্গারাটা… একটা দাও তো।”
ছেলে প্যাকেট খুলে।
কাগজের শব্দ।
ঘরটা ভারী হয়ে যায় না—
আরও স্থির হয়ে যায়।
ডায়েরিটা খোলা।
শেষ পাতায় লেখা—
“আজ—”
তার নিচে কিছু নেই।
সে কলমটা ধরে।
লিখতে চায়।
কিন্তু শব্দটা আর এগোয় না।
জানালার বাইরে গোধূলি নামে।
এইবার ধীরে না—
একটানা, নিরব।
যেন সে জানে—
কাউকে আটকানো তার কাজ না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।