স্টেশনের ছেলে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৬ মার্চ ২০২৬
সকাল সাতটার ট্রেনটা এখনও প্ল্যাটফর্মে পৌঁছায়নি। হুইসেল বাজছে দূরে, চাকা ঘোরে, মানুষ আসছে-যাচ্ছে। সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত তাড়াহুড়ো—নানান গতি, শব্দ, চাপের মধ্যে রিয়াদ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে চায়ের কেটলি, পাশে কাঠের টেবিল। আজও চোখের নিচে হালকা ফাঁপা দাগ, হাতে একটু কাঁপ, কিন্তু সে কোনোভাবে তা গোপন করার চেষ্টা করে। চা ঢেলে গেলে আবার নতুন করে ভাঙবে—এটি জানে।
মানুষের চোখে সে কেবল একজন শ্রমিক। কেউ থেমে দেখেনি, কেউ জিজ্ঞেস করেনি তার নাম বা পরিবারের কথা। প্রতিদিনের সংগ্রাম শুধু চোখে, হাতে, চায়ের কাপের নিচে দেখা যায়। কিন্তু রিয়াদ তা মনে রাখে, চুপচাপ তার কাজ চালায়।
আজ ভিড়ের মধ্যে একজন বয়স্ক যাত্রী এগিয়ে আসল। চোখে অদ্ভুত শান্তি, হাতে হালকা দমবন্ধ কাঁপ—কেউ জানে না ঠিক কীভাবে। সে শুধু চা চায়।
“এক কাপ চা,” বলল।
রিয়াদ কেবল কেটলি ধরে দাঁড়াল। আজকের চোখের দিকে তাকালো—কেউ প্রশংসা করছে না, কেউ কিছু বলছে না। শুধু একটা ছোট্ট স্বীকৃতি। চোখে এক অজানা আভা।
যাত্রী চুপচাপ এক কাপ চা নিল, কেটলিতে হাত রাখল। একটু চা ছিটকে গেল। রিয়াদ এক মুহূর্ত থমকে গেল, কিন্তু কেউ কিছু বলল না। ক্ষুদ্র এক অভিজ্ঞতা—না প্রশংসা, না নিন্দা, শুধু অবাধ্য বাস্তবতার সংস্পর্শ।
“তোমার নাম?”
রিয়াদ প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলতে বাধ্য হল, “রিয়াদ।”
যাত্রীর মুখে হালকা হাসি। “স্কুলে যাও?”
রিয়াদ মাথা নেড়ল। “না। কাজ করি। পরিবারের জন্য।”
কিছুটা থমকে। তারপর যাত্রী চুপচাপ চলে গেল। কিন্তু পরের দিনও, আরেকদিনও, সে আসল। কোনো বক্তৃতা নেই, কোনো শেখানো নেই। শুধু চোখে ধরা এক মুহূর্ত—রিয়াদের ভেতরে সামান্য অস্থিরতা, একটি প্রশ্নের সিঁড়ি খোলা।
রিয়াদ চা বানানোর মধ্যে নিজেকে হারায়। হাত কাঁপছে, কাপ ছিঁড়ে গেছে একবার, মাটিতে লাল দাগ। নিজের ভুলেই ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই থামতে চায় না।
দিনশেষে প্ল্যাটফর্ম নীলা হয়ে আসে। রিয়াদ টেবিল মুছে দেয়, চা ঠান্ডা। বাতাস ঠাণ্ডা, কিন্তু হাওয়ায় যেন ভেতরের আলো নাড়ছে। সে জানে—কেউ আজ তার কথা ভাবল, তার জীবনের ক্ষুদ্র মুহূর্ত মনে রাখল। ছোট, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।
পরদিন, পরেরদিন, সে আবার কাজ শুরু করে। কিন্তু হাতের কাঁপ, চোখের অস্থিরতা, ট্রেনের শব্দ—সবই অন্যভাবে প্রতিফলিত হয়। চোখে নতুন প্রতিফলন, ঠোঁট কামড়ে রাখা, হাতে কাপ ধরে দৃঢ় থাকা—সবই ছোট ছোট দিকনির্দেশ।
একদিন টেবিলের ফাটল থেকে কাগজের কোণা বেরিয়ে আসে। হাতে লেখা, তারিখ নেই। কেউ লিখেছে, জানা নেই কারা। রিয়াদ কেবল চোখ রাখে। বুঝতে পারে, শহরের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো এই ক্ষুদ্র জীবন—নিরাশা, একাকিত্ব—সবই কোনো না কোনোভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ তাকে শ্রমিক মনে করতে পারে। কেউ থামবে না, কেউ নাম মনে রাখবে না। কিন্তু সে জানে—ভেতরে ক্ষুদ্র আশা, ক্ষুদ্র সংগ্রাম আছে। চায়ের কেটলি হাতে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট ছেলে কতটা চেষ্টা করছে, কতটা ধৈর্য রাখছে—সেটা বোঝা যায় না।
রিয়াদ চুপচাপ নয়। সে ভাবতে শুরু করে—কখনো বড় হতে, পড়াশোনা করতে, অন্য শহরে যেতে। এই স্বপ্ন তার শক্তি, যা কেউ চুরি করতে পারবে না।
প্ল্যাটফর্মের মানুষ অচেতন। তারা দেখছে শুধু চায়ের কাপ, চাকা, হট্টগোল। কেউ ভাবছে না, এখানে দাঁড়ানো এই ছেলেটিরও গল্প আছে। কেউ যদি তা দেখত, হয়তো চোখে জল চলে আসত, হয়তো নিজেকে অন্যভাবে দেখতে শিখত।
রিয়াদ চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। ট্রেনের হুইসেল বাজে, ভিড়ের শব্দ ফিরে আসে। কিন্তু আজ ঘুম আসে না। হাতে কাপ শক্ত, চোখে কোনো ঝলক নয়—শুধু ট্রেনের আলোর প্রতিফলন, হাতের কাঁপা ধীর। এক মুহূর্তের সংবেদন।
স্টেশন, কোলাহল, চায়ের কাপ—সব ঠিক আছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হলো—কেউ এক মুহূর্তের জন্য তাকে শুধুই মানুষ হিসেবে দেখেছে।
এমনকি এক কাপ চা, এক মুহূর্তের দৃষ্টি, একখানা অজানা কাগজ—ছোট জিনিসগুলোই ভেতরের স্বপ্নকে নাড়া দিতে পারে।
রিয়াদ জানে, শহরের ভিড় কখনো থামে না। কিন্তু তার গল্প, তার হাতের কাঁপা, চোখের প্রতিফলন, চায়ের কাপ—সবই এখানে রয়ে গেছে। এই ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোই তার জীবনের গতি নির্ধারণ করে।
#স্টেশনেরছেলে #মানুষেরগল্প #সাধারণমানুষেরজীবন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।