শরতের শেষ বিকেল। আকাশে রঙিন মেঘেরা ভাসছে, আর নদীর বুকে হালকা ঢেউ। সেই নদীর ধারে বসে আছে অভিক। তার চোখ স্থির, অথচ বুক ভরা অস্থিরতায় কাঁপছে।
চারপাশের নিস্তব্ধতায় সে যেন শুনতে পাচ্ছে নারীদের হারানো আর্তনাদ—যারা একদিন ছিল জীবন্ত, প্রাণবন্ত, আর আজ কেবল নীরব লাশ। অভিক মনে মনে দেখে তাদের মুখ, তাদের শেষ মুহূর্তের ভয়।
রাষ্ট্র যাদের দোষী সাব্যস্ত করা উচিত ছিল, তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে দিব্যি। তাদের হাসিমুখ যেন শহরের বাতাসে বিদ্রূপ হয়ে ভাসছে। অভিকের বুক জ্বলে ওঠে।
“আমি লিখব,” অভিক ফিসফিস করে বলে। “তাদের নাম ইতিহাসে থাকবে। যেন সময় তাদের মুছে ফেলতে না পারে।”
অভিকের পাশে এসে বসে নিশি। তার হাতে একটিমাত্র মোমবাতি। সে আলো জ্বালে। অন্ধকারের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র প্রতিরোধ।
“তাদের কথা কেউ শোনে না, অভিক,” নিশি বলল। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “রাষ্ট্র অন্ধ, সমাজ বধির। আর আমরা?”
অভিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমরা লিখব, নিশি। আমরা যদি না লিখি, তারা হারিয়ে যাবে। ইতিহাস মুছে যাবে।”
নিশি চুপ করে তাকিয়ে রইল নদীর দিকে। তার চোখে অশ্রু, ঠোঁটে দৃঢ়তা।
“কিন্তু শুধু লেখা যথেষ্ট নয়। আমাদের শব্দকে আগুন বানাতে হবে।”
অভিকের মনে ভেসে আসে তার অতীত। সে একসময় রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করত। ভেবেছিল আদালত হবে ন্যায়ের মন্দির। কিন্তু যখন দেখল অপরাধীরা মুক্তি পাচ্ছে, আর ভুক্তভোগীর পরিবার লাঞ্ছিত হচ্ছে, তখন তার বিশ্বাস ভেঙে পড়ল।
নিশি অন্যরকম। সে ছোটবেলা থেকেই ভুক্তভোগীদের পাশে থেকেছে। সে জানে, প্রতিটি ছেঁড়া শাড়ি মানে একটি পরিবার ভাঙা। প্রতিটি নিভে যাওয়া চোখ মানে অসমাপ্ত স্বপ্ন।
“আমাদের যন্ত্রণা যদি লিখে না রাখি, তাহলে কে রাখবে?” নিশি অভিককে বলেছিল একদিন। “আমরা যদি নীরব থাকি, তবে আমরা অপরাধীদের মতোই অপরাধী।”
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে এলো। বাতাসে শিউলির গন্ধ। অভিক ডায়েরি খুলে লিখতে লাগল, “সে মেয়েটি, যে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়েছিল।
সে নদী, যাকে লুণ্ঠন করা হলো। সে সবুজ শাড়ি, যেটি উল্লাসে উড়ানো হলো।”
নিশি কলম ধরল। লিখল,
“তাদের নাম ইতিহাসে থাকবে। যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানে, কিভাবে সভ্যতা একদিন অমানবিক হয়েছিল।”
রাত গভীর হলো। চারদিকে অন্ধকার। নদীর ওপারের গ্রামে বিদ্যুৎ চলে গেছে। পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে অন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু তাদের সামনে ছোট্ট সেই মোমবাতি এখনও জ্বলছে।
“আমরা হয়তো পরিবর্তন আনতে পারব না,” নিশি ধীরে বলল।
“কিন্তু আমরা ইতিহাসকে হারাতে দেব না।”
অভিক আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি।
“তাহলে আমরা লিখব, লড়ব—যতদিন এই অগ্নিবীণা বাজে। আমাদের কলম হবে আগুন। আমাদের ডায়েরি হবে অস্ত্র।”
নিশি হাত বাড়িয়ে ধরল অভিকের হাত। দুজনের চোখে একই প্রতিজ্ঞা।
তাদের কণ্ঠ নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে গেল। রাতের আকাশে তারা ঝলমল করতে লাগল। যেন প্রতিটি তারা সাক্ষী হলো তাদের প্রতিজ্ঞার।
অন্ধকার যতই গভীর হোক, সেই অগ্নিবীণার সুর থামবে না।
আর সেই রাতে, নদীর তীরে, জন্ম নিল এক নতুন ইতিহাস—ন্যায়, সত্য আর মানুষের জন্য এক চিরন্তন সংগ্রামের।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।