বাবাকে ব্লক করেছি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৭ অক্টোবর ২০২৬
আমি আমার বাবাকে ব্লক করে রেখেছি, কারণ তিনি প্রতিদিন আমাকে টাকা চেয়ে মেসেজ দেন।
কথাটা শুনলে অনেকেই আমাকে নিষ্ঠুর বলবে। হয়তো বলবেও, যে বাবা ছেলেকে মানুষ করেছেন, সেই বাবার কয়েকটা মেসেজ সহ্য করতে পারে না ছেলে!
কিন্তু কেউ জানে না, বাবার মেসেজগুলো পড়ার আগে আমি নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যালান্স দেখি। তারপর বিকাশ খুলি। তারপর ফোনটা পাশে রেখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকি।
গত মাসে একটা চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরেছি। বাসায় ঢুকে জুতো খুলতে না খুলতেই বাবার ফোন।
“কী হলো?”
“হয়নি, বাবা।”
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, “আচ্ছা। চেষ্টা কর।”
এই কথাটুকু শুনে সেদিন একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, বাবা বুঝতে পারছেন।
পরদিন সকালেই মেসেজ এল।
“বাবা, দুই হাজার টাকা পাঠাতে পারবি?
ওষুধ কিনতে হবে।”
আমি মেসেজটা পড়ে অ্যাকাউন্ট দেখলাম। সেখানে সাতশো ত্রিশ টাকা। নিজের পকেটে ছিল একশো বিশ টাকা। আগের দিন বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে বাসায় ফিরেছি।
বাবাকে লিখলাম, “আমার কাছে টাকা নেই, বাবা।”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল, “আচ্ছা।”
শব্দটা ছোট। কিন্তু ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকতে থাকতে মনে হলো, বাবাকে আমি শুধু টাকার অভাবের কথা জানালাম না, নিজের অক্ষমতার কথাও আরেকবার স্বীকার করলাম।
দুদিন পর আবার মেসেজ।
“কিছু টাকা হলে পাঠাস। ঘরে বাজার নেই।”
তারপর আরেক দিন।
“তোর মায়ের ওষুধ শেষ।”
প্রতিবার একই ঘটনা। আমি টাকা পাঠাতে পারি না। বাবা আবার মেসেজ দেন। কোনো দিন রাগ করে কিছু বলেন না, কোনো দিন গালিও দেন না। শুধু প্রয়োজনের কথা জানান।
অথচ সেই কথাগুলোই আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠছিল।
বাবাও বলতেন, “তুই মানুষ হ। আমার আর কিছু লাগবে না।”
আমি মানুষ হয়েছি কি না, জানি না। শুধু চাকরিটা হয়নি।
এক রাতে বাবার মেসেজ এল।
“বাবা, পারলে পাঁচশো টাকা পাঠাস। খুব দরকার।”
আমি তখন বিছানায় শুয়ে ছিলাম। পাশের ঘরে বাড়িওয়ালা ভাড়া চাইতে এসে ফিরে গেছেন। আমার ফোনে বন্ধুর মেসেজ—আগের ধারটা কবে ফেরত দিতে পারব?
রান্নাঘরে চাল প্রায় শেষ। পরদিন সকালে কী খাব, সেটাও ঠিক ছিল না।
বাবার মেসেজ পড়ে হঠাৎ রাগ হলো।
কেন তিনি আমাকে বারবার বলছেন? কেন বুঝতে পারছেন না, আমি নিজেই চলতে পারছি না? কেন তাঁর কাছে আমি এখনও সেই ছেলে, যে চাইলে কোথাও থেকে টাকা জোগাড় করে ফেলতে পারবে?
আমি লিখলাম, “বাবা, আমার কাছে টাকা নেই। আর কতবার বলব?”
মেসেজটা পাঠিয়ে ফোনটা ছুড়ে বিছানায় ফেলে দিলাম।
কয়েক মিনিট পর বাবার উত্তর এল।
“ঠিক আছে। বিরক্ত করলাম, বাবা। তুই ভালো থাকিস।”
আমি মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
বাবা আমাকে ছোটবেলায় কখনো ‘বিরক্ত করলাম’ বলেননি। আমার জ্বর হলে সারা রাত মাথার কাছে বসে থাকতেন। স্কুলের বেতন দিতে দেরি হলে নিজের শখের জিনিস বিক্রি করেছিলেন—মা একদিন বলেছিলেন। সেই মানুষটাই এখন টাকা চাইতে গিয়ে আমাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছেন।
সেদিনই বাবাকে ব্লক করে দিলাম।
পরের কয়েক দিন ফোনটা একটু শান্ত ছিল। কোনো মেসেজ নেই, কোনো অনুরোধ নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে আর অ্যাকাউন্টের ব্যালান্স দেখতে হয় না। কেউ জিজ্ঞেস করে না, টাকা হয়েছে কি না।
তবু একদিন দুপুরে খেতে বসে মায়ের ফোন এল।
মা বললেন, “তোর বাবা তোকে ফোনে পাচ্ছে না। ফোনটা কি নষ্ট?”
আমি চুপ করে রইলাম।
মা আবার বললেন, “কাল থেকে তোর বাবার ওষুধ শেষ। আজ সকালে দোকানে গিয়েছিল, দাম শুনে ফিরে এসেছে।”
আমি ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমার কাছে টাকা নেই, মা।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “জানি রে। তোর বাবাও জানে।”
ফোনটা কেটে গেল।
আমি ভাতের থালার পাশে ফোনটা রেখে বসে রইলাম। স্ক্রিনে বাবার নম্বরটা খুঁজতে গেলাম। ব্লক করা নম্বরের তালিকায় তাঁর নামটা সবার ওপরে।
আঙুলটা নামের ওপর রেখে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম।
তারপর ফোনটা উল্টে রাখলাম। ভাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।