বাবার পুরোনো জুতো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
আবেগঘন ছোটগল্প। ১৯ অক্টোবর ২০২৬
অফিসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রটা হাতে পাওয়ার পর আরিফের প্রথম চিন্তা হয়েছিল, বাবা যেন না আসে।
প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠানে এবার তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে। ছবিসহ তার নাম ছাপা হয়েছে আমন্ত্রণপত্রে। সহকর্মীরা বলেছে, পরিবারের লোকজনকে নিয়ে যেতে। আরিফ মাকে ফোন করে শুধু অনুষ্ঠানের তারিখটা জানিয়েছিল। বাবার কথা ওঠার আগেই বলেছিল, “অনেক ভিড় হবে। তোমরা না এলেও চলবে।”
মা আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
অনুষ্ঠানের দিন সকালে বাবা ফোন করেছিলেন। আরিফ তখন অফিসের গাড়িতে, পাশে দুজন সহকর্মী। ফোনটা কেটে দিয়ে পরে বার্তা পাঠিয়েছিল, ‘কাজে আছি। রাতে কথা বলব।’
বাবা আর ফোন করেননি।
সারাটা অনুষ্ঠান আরিফের ভালোই কেটেছিল। মঞ্চে উঠে পুরস্কার নেওয়ার সময় ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হেসেছে। সহকর্মীরা হাততালি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান তার কাজের প্রশংসা করেছেন। ছবিও উঠেছে বেশ কয়েকটা।
বাড়ি ফিরে রাতের খাবার খাওয়ার সময় দরজায় কড়া নাড়ল একজন কুরিয়ারকর্মী।
আরিফের নামে একটা বাক্স এসেছে। প্রেরকের জায়গায় বাবার নাম লেখা।
বাক্স খুলে দেখা গেল, ভেতরে মিষ্টি। পরিচিত দোকানের সাদা বাক্স, লাল সুতো দিয়ে বাঁধা। সঙ্গে ছোট্ট একটা কাগজ—বাবার হাতের লেখা।
‘পুরস্কার পাওয়ার খবর শুনলাম। সবাইকে মিষ্টি খাওয়াস।’
আরিফ কাগজটা টেবিলে রাখল। মিষ্টির বাক্সটা সরাতে গিয়ে নিচে ভাঁজ করা একটা রসিদ পেল। সম্ভবত দোকানদার মিষ্টির বাক্সের সঙ্গে ভুল করে দিয়ে দিয়েছে।
রসিদটা খুব ছোট। এক পাশে জুতোর দোকানের নাম, অন্য পাশে হাতে লেখা হিসাব।
জুতো সেলাই — ২০ টাকা।
তার নিচে মিষ্টির দাম—৫০০ টাকা।
তারিখটা আজকের।
আরিফ রসিদটা উল্টে দেখল। পেছনে আর কিছু লেখা নেই।
বাবার জুতোর কথা তার মনে পড়ল। কালচে বাদামি রঙের পুরোনো একজোড়া জুতো। সামনের দিকে চামড়া উঠে গেছে, পেছনের অংশটা বারবার সেলাই করা। বাবা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে জুতোর ওপর হাত বুলিয়ে ধুলো মুছতেন। নতুন জুতো কেনার কথা বললে বলতেন, “এখনো তো চলে।”
আরিফ রসিদটা ভাঁজ করে মানিব্যাগে রাখল।
পরদিন বাবাকে ফোন করার জন্য নম্বরটা বের করেছিল। কল করার বোতামে আঙুল রেখেও চাপেনি। কী বলবে, বুঝতে পারেনি। অনুষ্ঠান নিয়ে বলবে? মিষ্টি পাওয়ার কথা বলবে? নাকি জিজ্ঞেস করবে, জুতোর সেলাই করতে মাত্র বিশ টাকা লাগল কেন?
ফোনটা রেখে দিয়েছিল।
এভাবে দিন গেল। অফিসের ছবিটা প্রতিষ্ঠানের পাতায় প্রকাশিত হলো। সহকর্মীরা অভিনন্দন জানাল। আরিফ ছবিটা নিজের পাতায়ও দিল। ছবিতে তার পায়ে চকচকে কালো জুতো। ছবির নিচে অনেক মন্তব্য জমল।
বাবার সঙ্গে কথা হলো না।
দুই সপ্তাহ পর ছুটির দিনে আরিফ বাড়ি গেল। মা দরজা খুলে বলল, “তোর বাবা বাজারে গেছে।”
বাবা ফিরলে আরিফ দেখল, তাঁর পায়ে সেই পুরোনো জুতো। সেলাইয়ের কালো সুতোটা পাশ থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
দুপুরে খাওয়ার পর বাবা ঘুমিয়ে পড়লেন। আরিফ তাঁর ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে রাখা জুতোর দিকে তাকাল। এক পাটি একটু কাত হয়ে পড়ে ছিল। সে জুতোটা তুলে সোজা করে রাখল।
তারপর নিজের পায়ের দিকে তাকাল। দামি জুতোর পালিশে ঘরের জানালার আলো চকচক করছে।
আরিফ কোনো কথা বলল না।
ঢাকায় ফিরে সে বাবার পাঠানো রসিদটা মানিব্যাগ থেকে বের করে টেবিলে রাখল। অফিসের অনুষ্ঠানের ছবিটাও প্রিন্ট করাল। ছবির পাশে রসিদটা রেখে অনেকক্ষণ বসে থাকল।
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে আলমারি খুলে নিজের কালো জুতোজোড়া বের করল। তারপর বাক্সের ভেতর থেকে বাবার পুরোনো জুতোটা তুলে পায়ে দিল।
জুতোর সামনের সেলাইটা আঙুলে খচখচ করছিল।
আরিফ ফিতা বাঁধল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।