নদীর তীরে বিচারালয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০৩, ২০২৬
নদীর ধারে বসে থাকা—এটা শুরুতে কোনো ঘটনা ছিল না। এখানে বিকেল প্রায়ই একই রকম আসে; চাঁদ ওঠে, আলো নামে, আর একটা স্থিরতা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে যেটাকে নীরবতা বললে পুরোটা ধরা যায় না। শব্দগুলো যেন হারিয়ে যায় না, কেবল অন্য কোনো স্তরে সরে গিয়ে অপেক্ষা করে।
মেঘ চাঁদের সামনে এসে দাঁড়ায়, আবার সরে যায়। এই চলাচলের ভেতর কোনো পরিকল্পনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবু দেখলে মনে হয় আকাশ নিজের ভেতরেই কোনো অনির্ণীত অবস্থায় আটকে আছে। দূরের একটা পাখির ডাক একবারই ভেসে আসে—না আনন্দ, না শোক; বরং অস্তিত্বের একটা অস্বস্তিকর ঘোষণা।
আমি একা ছিলাম। কিন্তু “একাকীত্ব” শব্দটা তখন ঠিক বসছিল না। ভেতরে একাধিক স্তর একই সঙ্গে সক্রিয়—একটা প্রশ্ন তুলছে, একটা উত্তর খুঁজছে, আরেকটা নীরবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই অবস্থায় নিজেকে একক মানুষ বলে ভাবা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবু সেদিন হঠাৎই একটা ধারণা এসে দাঁড়ায়—এটা কি কোনো বিচারালয়? কোনো কাঠামো নেই, কোনো নিয়ম নেই, তবু অনুভবটা সরানো যায় না। নদী সাক্ষীর মতো স্থির, চাঁদ দূরের কোনো পর্যবেক্ষকের মতো নীরব, আর বাতাস কেবল চলমান নথি লিখে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই পানিতে একটা শুকনো পাতা পড়ে।
ঘটনাটা খুব ছোট, প্রায় অদৃশ্য হওয়ার মতো। সাধারণত এমন কিছু মনে থাকে না। কিন্তু সেদিন পাতাটা ভেসে গেল না—কিছুক্ষণ থেমে রইল। সেই থেমে থাকা স্থির ছিল না, বরং দ্বিধার মতো। মনে হলো, এটা শুধু পাতা নয়; বরং কোনো পুরোনো সিদ্ধান্ত, যেটা অনেক আগেই ফেলে আসা হয়েছিল কিন্তু সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়নি।
কোন সিদ্ধান্ত? নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে খুব দূরের একটা স্মৃতি আছে—কারও সঙ্গে কথা না বলে সরে যাওয়া, কোনো ব্যাখ্যা না দেওয়া। তখন মনে হয়েছিল, নীরবতাই সবচেয়ে সহজ পথ। এখন সেই সহজতার ভেতরেই একটা ফাঁক দেখা দেয়।
চোখ বন্ধ করলে পরিবেশটা বদলে যায়।
কোনো কণ্ঠ নেই, কিন্তু প্রশ্ন আছে।
“তুমি কেন সেটা করেছিলে?”
“তুমি কি সত্যিই বুঝেছিলে, নাকি না বোঝাটাই সুবিধাজনক ছিল?”
প্রশ্নগুলো বাইরে থেকে আসে না। তারা ভেতর থেকেই তৈরি হয়। আর এখানেই অস্বস্তি—একই মানুষ প্রশ্ন করছে, আবার সেই প্রশ্নের বাইরে দাঁড়িয়ে উত্তর খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।
পাতাটা তখনও ভেসে আছে। মাঝ নদীতে এসে যেন স্থির। এই স্থিরতা শান্তি নয়, বরং অনিশ্চয়তা। মনে হয়, সে কোথাও পৌঁছাতে পারছে না, যেমন আমি নিজেও পারছি না।
ভেতরের একটা ক্ষীণ ধারণা বলে ওঠে—মানুষ অনেক সময় নিজের ওপর এমন দায় চাপায়, যেটার পুরোটা বাস্তব না হলেও মনে হয় সেটাই সত্য।
চোখ খুললে নদী আগের মতোই থাকে। কিন্তু আলো কিছুটা বদলে গেছে। চাঁদের রূপ এখন তীক্ষ্ণ, যেন সে আর কেবল সৌন্দর্য নয়, বরং পর্যবেক্ষণ। স্মৃতিগুলো আলাদা আলাদা টুকরোর মতো ভেসে ওঠে, কিন্তু একসাথে রাখলে একটা অসম্পূর্ণ চিত্র দাঁড়ায়।
একটা দৃশ্য ফিরে আসে—কাউকে কিছু না বলে দূরে সরে যাওয়া। খুব বড় কিছু নয়, তবু মনে থাকে। কারণ সেখানে ব্যাখ্যা ছিল না, এবং সেই অনুপস্থিতিই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেছে।
মেঘ ধীরে ধীরে চাঁদ ঢেকে দেয়।
আলো কমে আসে, কিন্তু কিছু ভাঙে না। বরং মনে হয় এই আড়ালও একই ব্যবস্থার অংশ। আলো সবকিছু দেখায় না, অন্ধকার সবকিছু লুকায়ও না—দুটোই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন শর্ত।
ভেতরের প্রশ্ন আবার ফিরে আসে—বিচার কি শাস্তি?
এইবার উত্তরটা স্থির নয়।
বিচার হয়তো শাস্তি নয়, বরং বোঝার চেষ্টা। তবে সেই বোঝা সবসময় স্বস্তি আনে না; কখনো কখনো শুধু অবস্থান বদলে দেয়, কিছু নিশ্চিততাকে নরম করে ফেলে।
পাতাটা ধীরে ধীরে ডুবে যায়।
ডুবে যাওয়া এখানে শেষ নয়। বরং মনে হয়, সে আরেকটি স্তরে চলে যাচ্ছে—যেখানে হারিয়ে যাওয়া আর রূপান্তর আলাদা কিছু নয়।
ভেতরের কণ্ঠ এবার শান্ত।
“তুমি কী বুঝলে?”
উত্তর সরাসরি আসে না। তবু একটি বিষয় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়—জীবন কোনো চূড়ান্ত রায় দেয় না। সে শুধু কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর সঙ্গে মানুষকে হাঁটতে হয়। সেই হাঁটার ভেতরেই অর্থ তৈরি হয়, যদিও তা কখনোই সম্পূর্ণ হয় না।
চাঁদ আবার মেঘের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে।
আলো ফিরে আসে, কিন্তু একরকম নয়। এতে এখন স্তর আছে—একই দৃশ্য একাধিক অর্থ বহন করে, কিন্তু কোনো অর্থই সম্পূর্ণভাবে প্রাধান্য পায় না।
আমি উঠে দাঁড়াই।
নদী আগের মতোই থাকে। কিন্তু দেখার ভেতরে কিছু বদলে গেছে। মনে হয়, দৃশ্য নয়—দৃষ্টি বদলেছে।
কারণ শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়—সবচেয়ে বড় বিচারালয় কোথাও বাইরে নেই। সেটা ভেতরের সেই জায়গা, যেখানে রায় কখনো শেষ হয় না, কেবল প্রশ্নের পুনর্গঠন চলতে থাকে।
আর সেই প্রশ্নই, নীরবে, পরের দিনের দিকে নিয়ে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।