ঝোলে মাছের গন্ধ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আমার মা মারা যাওয়ার পর বুঝলাম, আমাদের ফ্রিজে কখনোই মাছ ছিল না, শুধু মাছের ঝোল ছিল।
কথাটা মনে পড়েছিল মায়ের মৃত্যুর পরের দিন। ফ্রিজের পুরোনো জিনিসপত্র বের করছিলাম। একটা ছোট বাটিতে জমে থাকা মাছের ঝোল দেখে হঠাৎ মনে হলো, মা তো প্রতিদিনই মাছ রান্না করতেন। অথচ তাঁর পাতে মাছ দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না।
ছোটবেলায় মাছের মাথা খেতে আমার খুব ভালো লাগত। মা বাজার থেকে মাছ এনে রান্না করতেন। দুপুরে খেতে বসলে আমার প্লেটে মাছের বড় টুকরোটা তুলে দিতেন। নিজের প্লেটে নিতেন ঝোল আর দু-এক টুকরো আলু।
আমি বলতাম, “তুমি মাছ নেবে না?”
মা হাসতেন। “আমি মাছ পছন্দ করি না রে। তুই খা।”
কথাটা এতবার শুনেছি যে একসময় বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম।
মা মাছ পছন্দ করেন না। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারে টানাটানি ছিল। তবু মা সপ্তাহে অন্তত দুদিন মাছ কিনতেন। মাছের দাম বেশি হলে ছোট মাছ, কখনো পুঁটি, কখনো তেলাপিয়া। রান্নার সময় পুরো বাড়িতে মাছের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। আমি পড়ার টেবিল থেকে উঠে রান্নাঘরে উঁকি দিতাম।
মা বলতেন, “যা, পড়তে বস। খাওয়ার সময় হয়েছে।”
আমি চলে যেতাম। তারপর দুপুরে খেতে বসে দেখতাম, আমার পাতে মাছের টুকরো, মায়ের পাতে শুধু ঝোল।
একবার স্কুল থেকে ফিরে দেখেছিলাম, মা রান্নাঘরে বসে ভাত খাচ্ছেন। তাঁর থালায় ভাত আর কাঁচা মরিচ। পাশে মাছের ঝোলের হাঁড়ি। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “মাছ খাওনি?”
মা বলেছিলেন, “আজ ঝোল দিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। আমার বয়স তখন কতই বা—দশ কি এগারো।
বড় হওয়ার পর মায়ের সঙ্গে বাজারে যাওয়া কমে গেল। কলেজ, চাকরি, বন্ধু, নিজের জীবন—সব মিলিয়ে বাড়িতে ফেরার সময়ও কমে এল। মা ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন, “খেয়েছিস?”
আমি বলতাম, “হ্যাঁ, খেয়েছি।”
মা আবার জিজ্ঞেস করতেন, “মাছ খাস তো?”
আমি হাসতাম। “খাই মা, রোজই খাই।”
মা তখন বলতেন, “ভালো। শরীরের দিকে খেয়াল রাখিস।”
চাকরি পাওয়ার পর প্রথম বেতন হাতে পেয়ে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনেছিলাম। মা শাড়িটা বুকে চেপে ধরে বলেছিলেন, “এত দাম দিয়ে কেন কিনলি?”
আমি বলেছিলাম, “তোমার জন্য কিনেছি। পরবে।”
মা শাড়িটা আলমারিতে তুলে রেখেছিলেন। বলেছিলেন, ঈদের দিন পরবেন। সেই ঈদে শাড়িটা পরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেদিনও দুপুরে আমার পাতে মাছের বড় টুকরোটা তুলে দিয়েছিলেন।
আমি বলেছিলাম, “মা, এবার কিন্তু তোমার পাতে মাছ দিতে হবে।”
মা হেসে বলেছিলেন, “আমার আর মাছ খেয়ে কী হবে? তুই খা।”
তারপর একদিন হঠাৎ মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে কয়েক দিন থাকার পর আর বাড়ি ফিরলেন না।
মায়ের ঘর গুছাতে গিয়ে আলমারির নিচের তাকে একটা পুরোনো বাজারের ব্যাগ পেলাম। তার ভেতরে কিছু কাগজ, ওষুধের খালি পাতা আর ছোট্ট একটা হিসাবের খাতা। খাতার পাতায় মাসের বাজারের হিসাব লেখা। চাল, ডাল, তেল, সবজি—তার পাশে মাছের দামও আছে। কোনো মাসে মাছের পরিমাণ কম, কোনো মাসে একটু বেশি। শেষের দিকে একটা পাতায় লেখা ছিল, “এই সপ্তাহে মাছ একদিন কম কিনতে হবে। ছেলের বই লাগবে।”
আমি খাতাটা বন্ধ করে অনেকক্ষণ বসে রইলাম।
সেদিন বাড়িতে ফিরে ফ্রিজ খুলেছিলাম। একটা ছোট বাটিতে মাছের ঝোল ছিল। মাছের টুকরো নেই, শুধু আলু আর পাতলা ঝোল।
আমি বাটিটা বের করে টেবিলে রাখলাম। চামচ দিয়ে একটু ঝোল তুলে মুখে দিলাম। স্বাদটা চেনা। ছোটবেলা থেকে এই স্বাদই তো খেয়ে এসেছি।
হঠাৎ মনে পড়ল, মা সব সময় বলতেন, “আমি মাছ পছন্দ করি না।”
আমি বাটিটা নামিয়ে রাখলাম। তারপর মায়ের পুরোনো থালাটা আলমারি থেকে বের করে টেবিলে রাখলাম। থালাটা খালি ছিল।
অনেকক্ষণ পর বাটির ঝোলটা ফ্রিজে তুলে রাখলাম।
পরদিন বাজারে গিয়ে একটা মাছ কিনেছিলাম। বাড়ি ফিরে রান্না করলাম। খেতে বসে নিজের পাতে মাছ তুলে নিয়ে অভ্যাসবশত আরেকটা টুকরো আলাদা করে রাখতে গিয়েছিলাম।
হাতটা মাঝপথে থেমে গেল।
মায়ের থালাটা তখনও আলমারির ওপর রাখা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।