কামিনী ফুলের ঘরফেরা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । এপ্রিল ২৯,২০২৬
বইগুলো ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ফিরে আসে—এই কথাটা বুঝতে আমার সময় লেগেছিল। তখন মনে হয়েছিল এটা শুধু একটা ভাবনা, পরে বুঝেছি কিছু বিষয় ভাবনার চেয়ে বেশি ধীর, বেশি নিরব।
আমার ঘরের এক কোণে একটা পুরনো কাঠের টেবিল। এক পা সামান্য নুয়ে গেছে, নিচে পাতলা কাঠের শিরা দেখা যায়, আর ওপরে কফির দাগ শুকিয়ে গোল দাগ হয়ে আছে। এই টেবিলটা শুধু জিনিস রাখার জায়গা না—এটা আমার ভেতরের সময় জমে থাকার জায়গা।
তার ওপর কয়েকটা বই—একটা কবিতার বই, একটা পুরনো উপন্যাস, আর একটা খোলা খাতা, যেখানে এক জায়গায় কলমের কালি ছড়িয়ে গেছে, বাক্যটা শেষ হয়নি।
আমি এগুলো সরাই না। ধুলো জমলে কখনো ঝাড়ি না। ধুলো জমাট বাঁধলে মনে হয় সময় একটু ভারী হয়ে গেছে, কিন্তু পালায়নি।
তখন ঘরটা এমন ছিল না।
ঘরের ভেতরে একটা মিশ্র গন্ধ থাকত—চায়ের বাসি ঘ্রাণ, ভেজা চুল শুকানোর হালকা আর্দ্রতা, আর একটা ফুলের গন্ধ, যেটা ঠিক কোন ফুল বোঝা যেত না।
সে ছিল।
সে ঢুকলে দরজার কব্জা একটু শব্দ করত, তারপরই ঘরের বাতাসে একটা পরিবর্তন হতো—যেন জানালার পর্দা একটু সরে গেছে।
তার হাঁটার শব্দ খুব বেশি ছিল না, কিন্তু মেঝেতে একটা নিয়ম রেখে যেত।
একদিন দুপুরে সে বলল,
“আমার একটা কামিনী ফুল গাছ লাগাতে হবে।”
আমি চায়ের কাপ নামিয়ে একটু থামলাম।
“এই শহরে?”
সে আমার দিকে না তাকিয়েই বলল,
“শহর না, মাটি লাগে।”
তার হাতে তখন বাজারের একটা তালিকা ছিল, সেখানে দাগ দিয়ে কিছু জিনিস কাটা। সে কথাটা বলছিল খুব সাধারণভাবে, কিন্তু ভেতরে একটা সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল।
কয়েকদিন পর সে একটা মাটির টব নিয়ে এলো।
টবের গায়ে এখনো শুকনো লাল মাটি লেগে আছে, এক জায়গায় আঙুলের চাপের দাগ। সে সেটা ধোয়নি। শুধু বলল,
“এটা থাক।”
আমি নার্সারিতে গিয়েছিলাম। এক জায়গায় গাছের সারির মধ্যে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ লোক বলল,
“কামিনী ফুল এখন মৌসুমে নেই।”
তার কথার ভঙ্গি ছিল এমন, যেন গাছ না পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা।
আমি প্রায় ফিরে আসছিলাম।
শেষে একদিন ছোট একটা চারা পাওয়া গেল। পাতাগুলো সমান না, একটা একটু বাঁকা, যেন আলো ঠিকভাবে পড়েনি।
যেদিন চারা আনা হলো, সে সেটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না।
তার আঙুলে মাটির গন্ধ লেগে গেল, সে লক্ষ্য করল না।
তারপর বলল,
“এটা ঠিক আছে।”
সে চারা লাগাল জানালার পাশে, যেখানে বিকেলের আলো সরাসরি টেবিলের কোণে পড়ে। মাটি চাপা দেওয়ার সময় তার হাতের নখের নিচে মাটি ঢুকে গেল, সে সেদিকে তাকাল না।
আমি তখন মনে করেছিলাম, কিছু কাজ মানুষ যত্ন করে করে, আবার কিছু কাজ তারা যেন নিজের ভেতরের কোনো জায়গা থেকে করে ফেলে।
প্রথম কয়েকদিনে কিছু বদলায়নি।
তারপর পাতার মাথায় একটা হালকা সবুজ উঠল। খুব ধীর, প্রায় খেয়াল না করার মতো।
সে প্রতিদিন সকালে গাছটার কাছে যেত। একদিন আমি দেখলাম, সে পাতার ওপর জমে থাকা ধুলো আঙুলের ডগা দিয়ে সরাচ্ছে। আঙুলটা ভিজে আছে, হয়তো রান্নাঘর থেকে এসেছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“তুমি এত খেয়াল কর কেন?”
সে বলল,
“সব কিছু একদিন নষ্ট হতে পারে। আগে বাঁচুক।”
তার কণ্ঠে কোনো নাটক ছিল না, শুধু একটা অভ্যাসের মতো কথা।
গাছটা বড় হতে থাকল।
এক বিকেলে দেখি পাতাগুলো জানালার গ্রিল ছুঁয়ে গেছে। বাইরে বাতাস আসছে, কিন্তু পাতাগুলো ভেতরের দিকে আটকে আছে, যেন বের হতে চায় কিন্তু কোনো কারণে পারছে না।
সে দাঁড়িয়ে বলল,
“দেখো, এটা পালাতে চাইছে না। এটা ফিরতে চাইছে।”
আমি তাকিয়ে থাকলাম। জানালার গ্রিলের ফাঁকে একটা পাতা আটকে আছে, একটু কাঁপছে।
তারপর একদিন সে চলে গেল।
খুব সাধারণভাবে বলল,
“আমি যাচ্ছি।”
তার ব্যাগে একটা কাপড়, একটা ছোট খাতা, আর পুরনো কলম ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করিনি কোথায়। শুধু দেখলাম সে দরজার পাশে জুতা পরছে। জুতার ফিতে একটু ঢিলা ছিল, সে ঠিক করল না।
সে একবার ঘরের দিকে তাকাল। আমার মনে হলো, সে জানালার দিকেও তাকাচ্ছে, কিন্তু নিশ্চিত না।
তারপর দরজা বন্ধ হলো।
ঘরটা সেই মুহূর্তে বদলে গেল।
কোনো শব্দ হয়নি। শুধু বাতাস একটু থেমে গেল।
জানালার পাশে গাছটা ছিল। পাতায় তখনও ভেজা দাগ, সে সকালে পানি দিয়েছিল।
আমি বুঝলাম, কিছু কাজ মানুষের চলে যাওয়ার পরেও কিছুক্ষণ থেকে যায়।
দিন যেতে থাকল।
আমি গাছটার কাছে যেতাম। কিন্তু এখন আর কথা বলতাম না।
পাতাগুলো বড় হয়েছে, কিছুটা ছড়িয়ে পড়েছে। জানালার ধাতব গ্রিলে এক জায়গায় পাতার দাগ লেগে গেছে, ধুয়ে গেলেও হালকা ছাপ রয়ে গেছে।
এক রাতে বৃষ্টি হলো।
জানালার কাচে পানি পড়ার শব্দ হচ্ছিল—একটা ছন্দ ছাড়া, অনিয়মিত।
হঠাৎ ঘরের ভেতরে কামিনী ফুলের গন্ধ এলো।
আমি থমকে দাঁড়ালাম।
কারণ গাছটা তখনো ফুল দেয়নি।
আমি জানালার কাছে গেলাম।
গাছটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। পাতার ডগায় পানি জমে আছে, একটা জায়গায় পানি টপটপ করে নিচে পড়ছে।
তবু গন্ধটা পরিষ্কার।
এরপর আমি আর আগের মতো থাকিনি।
আমি খেয়াল করলাম, কিছু জিনিস বদলায় খুব ধীরে—টেবিলের দাগ, জানালার ধুলো, গাছের দিক বদল।
আর কিছু জিনিস বদলায় না—অপেক্ষা।
বছর কেটে গেল।
বইগুলোর ভেতরের কিছু পৃষ্ঠা ঢিলে হয়ে গেছে। খাতার কিছু লেখা কালি ছড়িয়ে গেছে, পড়া যায় না।
কিন্তু গাছটা বড় হয়েছে। একটা ডাল জানালার প্রায় বাইরে চলে গেছে, বাতাসে একটু দুলে।
একদিন দুপুরে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো পাতার ফাঁকে গন্ধ। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
পাতার ভাঁজে খুব হালকা, কিন্তু পরিষ্কার গন্ধ।
কামিনী ফুল।
আমি তখন কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে শুধু একটা ধারণার কাছাকাছি পৌঁছালাম—সব মানুষ চলে যায় না। কিছু মানুষ মাটিতে মিশে যায়, কিছু মানুষ গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই কথাটা প্রমাণের জন্য না, বরং অনুভব করার জন্য বেশি।
আজও আমি গাছটাকে পানি দিই।
কিন্তু আর কথা বলি না।
ঘরের বাতাসে সে যেটুকু ছিল, তা পুরোপুরি হারায়নি—শুধু জায়গা বদলেছে, হয়তো।
রাতে যখন ঘর খুব চুপ থাকে, তখন মনে হয় বইগুলো পাতার ভেতর থেকে একটু নড়ে উঠছে।
শব্দ করে না।
আর কামিনী ফুলের গন্ধ মনে করিয়ে দেয়—সব স্মৃতি শেষ হয় না, কিছু শুধু ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে ভার হয়ে থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।