স্মৃতির অতল গহীনে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ ছোটগল্প
তারিখঃ ১৩ অক্টোবর ২০২৫
আমার বয়স তখন চব্বিশ। সদ্য এম.এসসি সম্পন্ন করেছি। ঠিক সেই সময়েই ভালোবেসে ফেলেছিলাম এক মেয়েকে—নিশি।
সে তখন এস.এস.সি পরীক্ষার্থী। দেখতে শান্ত সুন্দর—হালকা পাতলা গড়ন, মুখে এক চিলতে হাসি যেন রোদের মতো মিষ্টি।
কিছুদিনের মধ্যেই ভালোবাসা আমাদের দুজনকে জড়িয়ে ফেলল। সময়টা খুব উদার ছিল না, তবুও বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করেছিলাম আমি—পঁচিশ বছর বয়সে, উনিশ বছরের সেই নিশিকে।
তখন আমি নিজেই ঠিকমতো লুঙ্গি সামলাতে পারতাম না—রাতে ঘুমের ঘোরে গিট দিতাম, অথচ সেই আমি চেষ্টা করতাম আমার ছোট্ট নিশিকে শাড়ি পরিয়ে দিতে। নিজের পকেটে খরচের টাকা না থাকলেও ওর জন্য আচার কিনে আনতাম। কী সরল, কী স্নিগ্ধ ছিল সেই দিনগুলো!
ভালোবাসা যেন অজান্তেই গেঁথে গিয়েছিল হৃদয়ের গভীরে। আমার জীবনের প্রথম সত্যিকারের ভালোবাসা ছিল নিশি—আমার ছোট্ট, মিষ্টি, নির্ভেজাল বউ।
সারাদিন হাসি, খুনসুটি, গল্পে ভরে থাকত আমাদের সংসার। রাতে ও বলত, “মাথা ব্যথা করছে।” আমি তার মাথা টিপে দিতাম, পা টিপে দিতাম। কারণ আমি ছিলাম তার সবকিছু। ভাবতাম, আজ অবুঝ নিশি, কাল বুঝবে—তখন নিশ্চয়ই আরও বেশি ভালোবাসবে আমায়।
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর শিক্ষক। নিশির বয়স যখন বাইশ, তখন সে আর হাসত না, খেলত না। এখন অনেক কিছুই বোঝে। ও যখন বাবার বাড়ি যেত, আমি একা হয়ে যেতাম। নিশি বলত, “তুমি আমার সঙ্গে চলো।” কিন্তু লজ্জায় কিছু বলতাম না। মনের কষ্ট বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতাম।
যখন ওকে রেখে ফিরে আসতাম, নিশি বায়না ধরত—“আমায় রেখে যেও না।” ফিরে এসে প্রতিদিন ফোন করতাম, তবুও প্রতিটি কলেই ‘ওয়েটিং’ দেখতাম। মেসেজের উত্তর না পেয়ে একসময় লজ্জায় মেসেজ করাও বন্ধ করে দিলাম।
তিন মাস পর শ্বশুরবাড়ি গেলে নিশির প্রথম কথা ছিল, “তিন দিন থেকে চলে যাবে?”
রাতে ওর ফোনটা চুপিচুপি খুলে দেখতাম—অজানা কারো প্রেমভরা মেসেজে আমার মেসেজগুলো চাপা পড়ে আছে। ভেতরটা পুড়ত, বুকটা কাঁপত, কিন্তু তবুও কিছু বলতাম না। শুধু নিশির মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে ক্ষমা চাইতাম নিজের অক্ষমতার।
তারপর নিশির বয়স পঁচিশে পা রাখল, আর আমাদের ঘরে এল প্রথম কন্যাসন্তান। আনন্দে ভরে উঠল মন। মেয়েটা যখন আধো আধো করে “বাবা” বলত, আমার হৃদয় ঠান্ডা হয়ে যেত। তিন বছর পর জন্ম নিল দ্বিতীয় মেয়ে। কিন্তু তখন নিশি যেন অন্য এক জগতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফোনে কথা বলত, উদাস চোখে তাকিয়ে থাকত। আমার প্রতি তার আচরণই বলে দিত—ভালোবাসা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
আমি কিছু বলতাম না—শুধু মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে যেতাম।
তারপর এলো সেই দুপুর—দুপুর ৩টা ৩৮ মিনিটে আমি সই করলাম ডিভোর্স পেপারে।
সেই কাগজের এক ফোঁটা কালি যেন ছিল আমার সমস্ত স্বপ্নের মৃত্যুর ছাপ।
নিশি চলে গেল নতুন ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে।
আমার মেয়েরা হলো মা-হারা।
তাদের কোলে তুলে নিজেই কেঁদেছি—আমার মেয়েরা কাকে ডাকবে “মা” বলে?
আমি রান্না করতাম, ওদের চুল বেঁধে দিতাম, ঘুম পাড়াতাম।
এই দুই মেয়ে আর আমি—এই ছিল আমার ছোট্ট পৃথিবী।
আর কোনোদিন বিয়ে করিনি, কারণ ভালোবাসতাম নিশিকে—তখনও, এখনো।
সময় থেমে থাকে না। একুশ বছর কেটে গেল।
আমার বড় মেয়ে এখন তেইশ বছরের—তার বিয়ের আয়োজন চলছে।
মনের গভীরে একটাই ইচ্ছে—সে যেন অন্তত একবার মাকে দেখে।
মেয়ে রাজি নয়, তবুও আমি নিশিকে খবর পাঠালাম।
পরের দিন এল নিশি।
চব্বিশ বছর ছয় মাস তিন দিন বাইশ মিনিট পর আবার দেখলাম ওকে।
বাস্তবে ও কল্পনার চেয়ে আলাদা—আমার মতোই চুলে পাক ধরেছে, চোখে ক্লান্তি, তবুও সেই দৃষ্টি এখনও চেনা।
আজ সে দু’ছেলের মা, তবুও চোখে সেই অপরাধবোধের ঝিলিক।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন আছো? এখনো কি মাথা বা পা ব্যথা করে?”
নিশি শুধু মাথা নাড়ল, মুখে নীরবতা, চোখে জল।
আমারও চোখ ভিজে উঠল।
ঠিক তখনই পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো আমার বড় মেয়ে।
স্বরটা কেঁপে উঠল—
“আমার বাবার চব্বিশটা বছর ফিরিয়ে দিতে পারবেন, মা?
যদি না পারেন, তাহলে আর আসবেন না কোনোদিন।
আমার বাবাই আমার মা।
আমি গর্ব করি, বাবা বলে ডেকে।”
নিশির চশমা ভিজে গেল।
চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল।
চুপচাপ ফিরে গেল সে।
আমি তাকিয়ে রইলাম ওর চলে যাওয়া পথের দিকে।
মনে হলো—ভালোবাসা সত্যিই কেমন করে হারিয়ে যায় স্মৃতির অতল গহীনে।
আমার বড় মেয়ে তখন এগিয়ে এলো, সদ্য মেহেদী রাঙানো হাতে আমার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,
“বাবা, আমরা তো আছি।
যে চলে গেছে, তাকে আর ডেকে লাভ কী?
যে তোমার ছিল না, তাকে কাছে টানার মানেই নতুন কষ্ট।”
আমি বুঝলাম—ভালোবাসা কখনো কখনো জীবন নয়,
একটা অসমাপ্ত স্মৃতি, যা চিরকাল ডুবে থাকে স্মৃতির অতল গহীনে।
#স্মৃতির_অতল_গহীনে #মোহাম্মদ_জাহিদ_হোসেন #ছোটগল্প #ভালোবাসা #বিরহ #বাংলা_সাহিত্য #জীবনের_গল্প #অনুভূতির_গদ্য #হৃদয়ের_ছোঁয়া #জীবনের_পাঠ #মানুষ_ও_ভালোবাসা #enolej_idea
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।