মেয়েটার স্বপ্ন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
মেহরিন চাকরিটা পেল।
খবরটা শুনে প্রথমে খুব খুশি হয়েছিল সে। তারপর বুঝল, আসল লড়াইটা অফিসে না, বাড়িতেই শুরু হবে।
মেহরিন ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিল।
তাদের সংসার খুব স্বচ্ছল ছিল না। বাবা নিউ মার্কেটের পাশে ছোট একটা স্টেশনারির দোকান চালাতেন। কোনো মাস ভালো যেত, কোনো মাসে হিসাব মেলাতে কষ্ট হতো।
তবু মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি কখনো না বলেননি।
মাঝে মাঝে রাতে হিসাবের খাতা নিয়ে বসে থাকতেন। মেহরিন দেখত, বাবা কিছু একটা মিলিয়ে দেখছেন।
জিজ্ঞেস করলে বলতেন, "কিছু না মা, তোর বইয়ের টাকার হিসাব করছি।"
তখন সে বুঝত না। এখন বুঝতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষার পর যখন চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পেল, মেহরিন অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। কাগজটা বারবার দেখছিল।
সে প্রথমে মায়ের কাছেই গেল।
"মা, আমি চাকরি পেয়েছি।"
মা হাসলেন। মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই মুখটা একটু থেমে গেল।
মেহরিন সেটা বুঝেছিল। কারণ মায়ের ভয়টা সে জানত।
কয়েকদিন পর থেকেই পরিচিত মানুষের কথা শুরু হলো।
"মেয়ে এখন চাকরি করবে? বিয়ের কী হবে?"
"এত দূরে যাতায়াত করবে কীভাবে?"
"চাকরি আর সংসার একসঙ্গে সামলাতে পারবে?"
কেউ সরাসরি মেহরিনকে বলত না। কিন্তু এসব কথা ঘরের ভেতর ঢুকতে বেশি সময় লাগত না।
এক রাতে বাবা খাবার টেবিলে বসে বললেন, "অফিসটা যদি একটু কাছে হতো ভালো হতো।"
মেহরিন চুপ করে রইল।
"বাবা, তুমি কি চাও আমি চাকরিটা না করি?"
বাবা চমকে তাকালেন। "না না, তা না।"
একটু থেমে বললেন, "তোর কষ্ট হবে কিনা, সেটা ভাবছি।"
মেহরিন নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, "কষ্ট তো হবেই বাবা। কিন্তু সব ভালো জিনিস পেতে একটু কষ্ট তো করতেই হয়।"
বাবা আর কিছু বললেন না।
চাকরির প্রথম দিন মেহরিন খুব ভোরে উঠে তৈরি হয়েছিল। নতুন একটা নীল সালোয়ার কামিজ। একটা সাধারণ ক্যানভাসের ব্যাগ।
মা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে মেয়েকে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন, "নিজের যত্ন নিস।"
মেহরিন একটু অবাক হয়ে তাকাল। কারণ সে ভেবেছিল, মা হয়তো আবার বলবেন, "মানুষ কী বলবে।"
কিন্তু মা সেদিন আর কারও কথা বলেননি।
শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না।
সকালে তাড়াহুড়ো করে বের হওয়া। অফিসের কাজ। ফিরে ঘরের কাজ। অনেক দিন রাতে বিছানায় শুয়ে মনে হতো, আর পারছে না।
কিন্তু পরদিন সকাল হলেই আবার উঠে দাঁড়াত।
তারপর একদিন বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ডাক্তারের কাছে যাওয়া, পরীক্ষা, ওষুধ, সব মিলিয়ে হঠাৎ করে সংসারের হিসাব বদলে গেল।
মেহরিন নিজের জমানো টাকা বের করল। বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করল।
যে মানুষগুলো একসময় বলেছিল, "মেয়েদের এত পড়াশোনা করিয়ে লাভ কী?"
তারাই পরে এসে বলল, "মেহরিন তো অনেক দায়িত্বশীল মেয়ে।"
মেহরিন এসব শুনে শুধু হাসত।
এক রাতে বাবা বারান্দায় বসেছিলেন। মেহরিন পাশে গিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর বাবা বললেন, "জানিস, তুই যখন চাকরি করতে চেয়েছিলি, তখন আমি ভয় পেয়েছিলাম।"
মেহরিন হাসল। "কিসের ভয়?"
বাবা ধীরে বললেন, "ভয় ছিল, মানুষ কী বলবে।"
একটু থেমে আবার বললেন, "এখন বুঝি, মানুষ তো দুই দিন কথা বলে। কিন্তু নিজের মানুষ পাশে থাকে অনেক দিন।"
মেহরিন কিছু বলল না। শুধু বাবার হাতটা ধরে রাখল।
কয়েক বছর পর। একদিন মা আলমারি গোছাতে গিয়ে মেহরিনের চাকরির প্রথম দিনের ছবিটা পেলেন।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর বললেন, "সেদিন যদি তোকে আটকাতাম..."
মেহরিন মায়ের হাত ধরে বলল, "তাহলে হয়তো আমিও জানতাম না, আমি কী করতে পারি।"
সেদিন রাতে মেহরিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। দূরে শহরের আলো জ্বলছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।