সুন্দর হওয়ার অপরাধ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আমার বড় বোনের বিয়ে হচ্ছে না, কারণ আমি দেখতে তার চেয়ে সুন্দর।
কথাটা বলতে আমার লজ্জা হয়। বোনের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পেছনে আমার হাত ছিল, এ কথাটাও কাউকে বলতে পারিনি।
আমাদের বাড়িতে বিয়ের সম্বন্ধ এলে প্রথমে বড় বোন মিতুর ছবি পাঠানো হতো। তারপর কোনো একপর্যায়ে ছেলের বাড়ির লোকজন আমাকে দেখতে চাইত। মা বলতেন, “ছোট মেয়েটাকেও একবার দেখবেন। দুই বোন তো একই বাড়িতে থাকে।”
সেই একবার দেখাটাই ধীরে ধীরে নিয়ম হয়ে গেল।
ছেলের মা মিতুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, “তুমি কী পড়ছ?”
কেউ বলতেন, “ছোট মেয়েটা তো বেশ সুন্দর!”
কথাটা বলার সময় তাঁরা এমনভাবে মিতুর দিকে তাকাতেন, যেন তাঁর সামনে বসে থাকা মানুষটার কোনো ঘাটতি আছে।
মিতু হাসত। চায়ের কাপ এগিয়ে দিত। তারপর রান্নাঘরে চলে যেত।
একদিন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তোর খারাপ লাগে না?”
মিতু কাপ ধুতে ধুতে বলেছিল, “কীসের?”
“সবাই তোকে দেখতে এসে আমার কথা বলে।”
ও কলটা বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়েছিল।
“তুই কি ইচ্ছে করে সুন্দর হয়েছিস?”
আমি হেসে বলেছিলাম, “আহা, আমি কী করব?”
মিতু আর কথা বাড়ায়নি।
গত বছর ওর জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছিল। ছেলেটা ব্যাংকে চাকরি করত। তার মা ফোনে মিতুর সঙ্গে কথা বলে পছন্দ করেছিলেন। দুই পরিবার দেখা করার দিন ঠিক করল।
সেদিন মিতু নিজের পছন্দের নীল শাড়িটা বের করেছিল। আমাকে ডেকে বলল, “দেখ তো, কেমন লাগছে?”
আমি বললাম, “ভালো।”
ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছিল। অনেক দিন পর ওকে এতটা খুশি দেখাচ্ছিল।
ছেলের বাড়ির লোকজন আসার আগে মা আমাকে বললেন, “তুইও একটু সাজগোজ করে থাকিস। ওরা যদি তোর কথাও জিজ্ঞেস করে!”
আমি নতুন জামাটা বের করলাম। মেহমান আসবে, একটু সেজে থাকলে ক্ষতি কী? চুল ছেড়ে রাখলাম, হালকা সাজলাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজের দিকে তাকালাম। মিতুর শাড়িটা নীল, আমার জামাটা একটু বেশি উজ্জ্বল। বিষয়টা তখন আর মনে হলো না।
ছেলের বাড়ির লোকজন আসার পর প্রথমে মিতুর সঙ্গে কথা হলো। তারপর ছেলের মা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বিয়ের কথা চলছে?”
আমি বললাম, “না, এখনো না।”
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “তোমার জন্য তো ভালো সম্বন্ধ পাওয়া কঠিন হবে না।”
মিতু তখন চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
যাওয়ার আগে ছেলের মা আমার পড়াশোনা, পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে অনেক কথা বললেন। মিতুর সঙ্গে আর বিশেষ কথা হলো না।
কয়েক দিন পর খবর এল, সম্বন্ধটা আর এগোবে না।
মা বললেন, “ওদের নাকি মেয়েকে পছন্দ হয়নি।”
আমি চুপ করে ছিলাম। যাওয়ার আগে ছেলের মা আমাকে আলাদা করে বলেছিলেন, তাঁর ছেলে নাকি ছোট মেয়েটার কথা বেশি জানতে চাইছে।
কয়েক সপ্তাহ পর ছেলেটা আমাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা পাঠাল।
“আপনার সঙ্গে সেদিন ঠিকমতো কথা বলা হয়নি। আপনার আপত্তি না থাকলে পরিচিত হতে চাই।”
বার্তাটা পড়ে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। তারপর উত্তর দিলাম, “আমার আপত্তি নেই।”
কথা চলতে থাকল। একদিন সে সরাসরি বিয়ের কথা বলল।
আমি জানতাম, সে মিতুকে বিয়ে করতে এসেছিল। তবু কথাটা থামাইনি। মিতুকে কিছু বলার কথাও মনে এসেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলিনি।
এক সন্ধ্যায় মিতু আমার ফোনের পর্দায় ছেলেটার নাম দেখে ফেলল।
ও ফোন কেড়ে নেয়নি, চিৎকারও করেনি। শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, “ও কি তোকে বিয়ে করতে চায়?”
আমি চুপ করে ছিলাম।
মিতু আবার বলল, “তুই কি জানিস, ওরা প্রথমে আমার জন্য এসেছিল?”
আমি মাথা নিচু করলাম।
“জানি।”
ও আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল।
পরদিন সকালে মিতু নাশতা বানিয়েছিল। আমার চায়ে চিনি কম হয়েছে কি না, সেটাও জিজ্ঞেস করেছিল। শুধু বিয়ের সম্বন্ধ এলে ও আর আয়নার সামনে দাঁড়াত না। নতুন শাড়িও বের করত না।
গত সপ্তাহে এক আত্মীয়া মাকে বলছিলেন, “ছোট মেয়েটার বিয়ে আগে দিয়ে দিন। বড়টার জন্য পরে দেখা যাবে।”
মা কোনো উত্তর দেননি।
মিতু পাশের ঘর থেকে কথাটা শুনেছিল। সন্ধ্যায় নিজের আলমারি খুলে নীল শাড়িটা ভাঁজ করে নিচের তাকে রেখে দিল।
আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
“শাড়িটা পরিস না কেন?”
মিতু আলমারি বন্ধ করে বলল, “এমনিই।”
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোর ওই ছেলেটার সঙ্গে কথা হয় এখনো?”
আমি মাথা নিচু করলাম।
“না।”
মিতু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ভালো।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।