ঢাকার এক ছোট গলিতে জন্ম নিল অভিক নিশির ভালোবাসা। কলেজে দেখা, বর্ষার রাতে একসাথে বই পড়া, হাসি—সব মিলিয়ে গড়ে উঠল স্বপ্নের জীবন। তারা কল্পনা করেছিল একটি ছোট ঘর, ভালোবাসায় ভরা জীবন, যেখানে অন্ধকার থাকবে না। কিন্তু ভাগ্য অন্য গল্প লিখল।
বিয়ের পর সুখ ছোট হয়ে এলো। অভিকের শরীর ক্রমশ দুর্বল হতে লাগল। নিশি চেষ্টা করল চিকিৎসার, কিন্তু দারিদ্র্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। তাদের ঘর হয়ে উঠল নিঃশব্দ এক সংগ্রামের জায়গা, যেখানে প্রতিটি নিশ্বাসে লুকিয়ে থাকল মৃত্যুর ছায়া।
এক গভীর রাতে অভিকের শ্বাস বাধা পেল। নিশি তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। করিডরের দৃশ্য ছিল এক নিস্তব্ধ করুণতা—মৃত্যুর আর্তনাদ, স্বজনদের কান্না, ডাক্তারদের ব্যস্ততা। ডাক্তার জানাল—বেড নেই, অক্সিজেন লাগবে, কিনতে হবে। নিশির হাতে ছিল মাত্র কয়েকশো টাকা, অথচ অক্সিজেনের দাম দুই হাজার টাকা।
নিশি বুঝল—জীবন আজ টাকার কাছে বন্দি। অভিকও জানল, এখানে শুধু রোগ নয়, টাকা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। করিডরের দেয়ালে লেখা দুঃখের ছবি যেন তার মনের মধ্যে চিরস্থায়ী হয়ে গেল।
রাত গভীর হলো। ডাক্তার জানাল—টাকা ছাড়া ICU নেই। নিশি কাঁদতে কাঁদতে অভিকের হাত চেপে ধরে। অভিক শান্ত মুখে হাসল—আলো হৃদয়ে জন্ম নেয়, টাকার কাছে বিক্রি হয় না।
অভিকের শেষ নিশ্বাস হাসপাতালের করিডরে গেল। নিশি জানল—তার কাছে আর অভিক নেই, তবে তার স্মৃতিই বেঁচে থাকবে।
অভিকের চলে যাওয়ার পর নিশির জীবন হয়ে গেল একাকীত্বের সমুদ্র। দিনের পর দিন তার চোখে শুধু অভাব, হৃদয়ে শুধু এক শূন্যতা। সে হাসপাতালের করিডর, অভিকের গল্প, মানুষের বেদনা—সব স্মরণ করে বেঁচে থাকে।
একদিন নিশি করিডরে দাঁড়িয়ে দেখল—এক বৃদ্ধ যাকে হাসপাতালে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না টাকার অভাবে। শিশুর কান্না, স্বজনদের আহাজারি—সব মিলে এক হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য। সে বুঝল—অভিকের মৃত্যুর পেছনে শুধু রোগ নয়, চিকিৎসা ব্যবস্থার নির্মমতা। টাকা ছাড়া এখানে বাঁচা অসম্ভব।
নিশি একটি ছোট পত্রিকায় লিখতে শুরু করল—অভিকের গল্প, হাসপাতালের করিডরের ছবি, মানুষের বেদনা। তার কলম হয়ে গেল মানুষের গলার স্বর। সমাজ জানতে পারল—চিকিৎসা শুধু রোগের নয়, টাকার বিষয়।
নিশি শুরু করল একটি উদ্যোগ—“আলোর হাত” নামে সাহায্য কেন্দ্র। সেখানে গরিবদের জন্য চিকিৎসা, ওষুধ, অক্সিজেন সংগ্রহ করা হলো। অভিকের স্মৃতি সেই উদ্যোগে আলোর রূপ নিল।
“আলোর হাত” মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। হাসপাতালের করিডরে যেমন মৃত্যুর সুর থাকে, তেমনি জন্ম নিল নতুন আলো—আশা ও মানবতার। নিশি বুঝল—অভিকের জীবন নিরর্থক হয়নি।
নিশি জানল—আলো চোখে নয়, হৃদয়ে জন্ম নেয়। অভাব, দারিদ্র্য, রোগ—এসব হার মানাতে পারে হৃদয়ের শক্তি। সে তার অভিজ্ঞতা মানুষের সঙ্গে ভাগ করে দেয়।
“আলোর হাত” ছোট হলেও একটি আন্দোলনে পরিণত হয়। মানুষ বুঝতে শুরু করে—চিকিৎসা শুধু রোগের নয়, মানবাধিকারের বিষয়। টাকার অভাবে কেউ মারা যাবে না—এটি একটি মৌলিক দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
নিশি করিডরের এক কোণে বসে অভিকের ছবিটিকে দেখে। তার চোখে অশ্রু, মুখে শান্তি। সে জানল—অভিকের জীবন, হাসপাতালের করিডরের দৃশ্য, সব মিলিয়ে দিয়েছে এক বার্তা—
আসল আলো শরীরে নয়, হৃদয়ে। আর সেই আলো কখনো টাকার কাছে বিক্রি হয় না।
করিডরের অন্ধকারে তখন আলো জ্বলে—একটি মানবতার জাগরণ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।