ভাঙা মগ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১৩ জুন ১০২৬
ডিভোর্সের কাগজে সই করার সময় মেহরিন কাঁদেনি। আদালত থেকে বের হয়ে রিকশায় উঠে বসেছিল। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করেছিল, “কোথায় যাবেন আপা?” কয়েক সেকেন্ড থেমে সে বলেছিল, “মিরপুর।”
মায়ের বাসায় পৌঁছে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সন্ধ্যায় মা এসে বললেন, “একটু ভাত খেয়ে নে।” মেহরিন বলল, “পরে খাব।” খাওয়া আর হলো না। রাতটা জেগে কেটেছে, ভোরের দিকে একটু চোখ লেগেছিল। ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ বসে রইল। পাশের দিকে হাত বাড়াল, অর্ধেক বিছানা খালি। হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল।
ঘরের কোণে রাখা স্যুটকেসটা চোখে পড়ল। গত রাতে খুলেছিল। কাপড় সরাতে সরাতে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল একটা সাদা মগ, হাতল ভাঙা।
বিয়ের প্রথম ঈদে পাওয়া উপহার। একদিন হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। তখন আর ফেলে দেয়নি, “পরে ঠিক করব” ভেবে রেখে দিয়েছিল। পরে আর কিছুই ঠিক হয়নি, শুধু লুকিয়ে রাখা হয়েছিল কাপড়ের ভেতর।
মেহরিন মগটা কিছুক্ষণ ধরে দেখল। ভাঙা অংশে আঙুল ছুঁইয়ে আবার কাপড়ের নিচে ঢুকিয়ে দিল।
এরপর দিনগুলো খুব আলাদা ছিল না, শুধু ভারী ছিল। ফোন আসত। আত্মীয়, পরিচিত, অনেকদিন কথা নেই এমন মানুষও।
“কী হয়েছিল?”
“এত দূর কেন গেল?”
“আরেকটু মানিয়ে নিতে পারতে না?”
মেহরিন সব প্রশ্নের উত্তর দিত না। কখনও বলত, “সব কথা সবার জন্য না।” কখনও চুপ থাকত।
এক বিকেলে পাড়ার এক খালাম্মা মায়ের সঙ্গে বসে বললেন, “মেয়েদের একটু সহ্যশক্তি থাকতে হয়। এখনকার মেয়েরা একটু তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেয়।”
পাশের ঘর থেকে মেহরিন রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, চায়ে চিনি দিয়েছ তো?”
চামচের শব্দ থেমে গেল। মা এক মুহূর্ত চুপ করে গেলেন। খালাম্মা আর কিছু বললেন না। ঘরটা অস্বাভাবিকভাবে চুপ হয়ে রইল কিছুক্ষণ।
মেহরিন আবার নিজের কাজে ফিরে গেল।
সেদিন রাতে ঘুম আসেনি। জানালার পাশে বসে ছিল। মানুষ কত সহজে অন্যের জীবনের হিসাব বসিয়ে দেয়, অথচ ভেতরের লড়াই দেখে না।
কয়েক মাস পর একটা চাকরি পেল। শুরুটা সহজ ছিল না। নতুন মানুষ, নতুন নিয়ম।
একদিন রিপোর্টে ভুল হলো। বস সবার সামনে বকা দিলেন। মেহরিন কিছু বলল না। বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চোখ ভিজে আসছিল। কয়েক সেকেন্ড নিজের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “এইটুকুতেই থেমে যাবি?”
মুখে পানি দিয়ে ফিরে গেল ডেস্কে।
মাসের শেষে প্রথম বেতন হাতে পেল। টাকাটা বড় না, কিন্তু নিজের মনে হলো এটা আলাদা কিছু। সেদিন নিজের জন্য একটা শাড়ি কিনল, মায়ের জন্য একটা ব্যাগ।
মা ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললেন, “এগুলো কেন?”
মেহরিন বলল, “ইচ্ছে হলো।”
মা কিছু বললেন না, শুধু একটু হাসলেন।
সময়ের সাথে সাথে মানুষের কথা কমেনি, শুধু তার ভেতরের কাঁপা কমে গেছে।
একদিন অফিসের ক্যান্টিনে একা বসে চা খাচ্ছিল। কারও জন্য অপেক্ষা নেই, কারও সাথে হিসাব নেই। অদ্ভুতভাবে হালকা লাগল।
সেদিন বুঝেছিল, একা থাকা আর একাকী থাকা এক জিনিস না।
এক সন্ধ্যায় বাসে জানালার পাশে বসেছিল মেহরিন। শহরের আলো জ্বলতে শুরু করেছে। ফোন বাজল। মা।
“কোথায় তুই?”
“পৌঁছে যাচ্ছি।”
“ডিম নিয়ে আসিস কিন্তু।”
“আচ্ছা।”
ফোন কেটে জানালার বাইরে তাকাল।
শহর আগের মতোই চলছে।
হঠাৎ স্যুটকেসের ভেতরের ভাঙা মগটার কথা মনে পড়ল। অনেকদিন খোলা হয়নি। হয়তো এখনও আছে, একই জায়গায়।
জানালার বাইরে শহর চলতে থাকল। ভেতরে, কাপড়ের নিচে, একটা ভাঙা হাতল চুপচাপ পড়ে রইল।
আর সেটাই যথেষ্ট।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।