পৃথিবীর মতো তুমি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৪ আগস্ট ২০২৬
রাত প্রায় বারোটা। নিশি জানালার পাশে বসে পুরোনো একটা ছবি দেখছিল। ছবিটা সে কাউকে দেখাত না। এমনকি অভিককেও না। আলমারির নিচের তাকে একটা পুরোনো শাড়ির ভাঁজে রেখে দিয়েছিল। আজ কাপড় গোছাতে গিয়ে আবার বেরিয়ে এসেছে।
ছবিতে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে নিশি। বয়স তখন কম। চুল বাতাসে এলোমেলো। চোখে রোদের ঝিলিক। মুখে এমন এক হাসি, যেটা এখনকার নিশির মুখে খুব কম দেখা যায়। ছবিটা তুলেছিল অভিক।
অভিক ঘরে ঢুকে তাকে দেখে বলল, “আবার ওইটা?”
নিশি ছবিটা উল্টে রাখল। “কোনটা?”
“যেটা দেখলে তুমি আমার কাছ থেকে লুকাও।”
“সবকিছু তোমাকে দেখাতে হবে নাকি?”
“না। কিন্তু ওই ছবিটা দেখলে তুমি এমন করো কেন?”
নিশি উত্তর দিল না।
অভিক বিছানার কিনারায় বসে জুতো খুলতে লাগল। গত কয়েকদিন ধরে মানুষটা একটু বেশি চুপচাপ। সন্ধ্যার পর বারান্দায় বসে থাকে। ফোন এলে বাইরে গিয়ে কথা বলে। ফিরে এসে বলে, “কাজের কথা।”
নিশি জানে, কাজের কথায় মানুষের মুখ এমন হয় না।
“আজ ডাক্তার কী বলল?” সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
অভিক থেমে গেল। “কোন ডাক্তার?”
“যার কাছে গিয়েছিলে।”
“কিছু না।”
“কিছু না মানে?”
“কয়েকটা পরীক্ষা করতে বলেছে।”
“কী পরীক্ষা?”
অভিক এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “নিশি, আজকে না।”
নিশি চুপ করে গেল। এই “আজকে না” কথাটা সে খুব ভালো চেনে।
অভিকও বুঝল, কথাটা একটু বেশি কঠিন হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর বলল, “রাগ করছ?”
“না।”
“তোমার ‘না’ মানে তো হ্যাঁ।”
“তুমি খুব জ্ঞানী হয়ে গেছ।”
অভিক হেসে ফেলল। নিশিও হাসল। তবে চোখ নামানোই রইল।
ঘরের বাইরে পাশের গলির জেনারেটর গুনগুন করছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।
নিশি মোবাইলের আলো জ্বালল।
অভিক বলল, “মোমবাতি কোথায়?”
“রান্নাঘরের ওপরের তাকে।”
“তুমি আনো।”
“তুমি যাও।”
“আজকে আমার হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।”
নিশি তার দিকে তাকাল। “কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
নিশি আর কিছু বলল না। উঠে মোমবাতি নিয়ে এল। মোমবাতি জ্বালানোর পর ঘরটা কেমন পুরোনো মনে হলো।
অভিকের চোখ আবার টেবিলের ওপর রাখা ছবিটার দিকে গেল। সে ছবিটা হাতে নিল।
“এই ছবিটা এত লুকিয়ে রাখো কেন?”
নিশি ধীরে বলল, “কারণ ওই মেয়েটাকে আমি চিনি।”
“কীভাবে?”
“ও অনেক কিছু বিশ্বাস করত।”
“এখন করো না?”
“সবকিছু না।”
অভিক ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “জানো, তোমার মুখটা আমার কাছে কেমন লাগে?”
নিশি তাকাল। “কেমন?”
অভিক একটু চুপ করে বলল, “মহাকাশ থেকে দেখা পৃথিবীর মতো।”
নিশি হেসে ফেলল। “আবার শুরু করেছ?”
“শোনো না।”
“বলো।”
“দূর থেকে পৃথিবীকে খুব শান্ত লাগে। ছোট্ট একটা গোল বল। অথচ তার ভেতরে কত কিছু—মানুষ, নদী, শহর, যুদ্ধ, ভালোবাসা। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না।”
নিশি চুপ করে শুনছিল।
অভিক ছবিটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তোমার মুখও তেমন।”
“আমার মুখে যুদ্ধ আছে?”
“আছে।”
“নদী?”
“আছে।”
নিশি একটু হেসে বলল, “ভালোবাসা?”
অভিক থামল।
“ওটা সবচেয়ে বেশি।”
নিশি মুখ নামিয়ে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল, “তুমি আমাকে বদলাতে চাওনি কখনো?”
অভিক হেসে উঠল। “চেয়েছি তো।”
“কখন?”
“ওই যে তিন দিন কথা বললা না। তখন মনে হইছিল, একটু কম রাগী হইলে ভালো হইতো।”
“তখন বলোনি কেন?”
“বললে চার দিন কথা বলতে না।”
নিশি এবার হেসে ফেলল।
“ভয় পেতে তুমি খুব ভালো পারো।”
“তোমার কাছে?”
“হুম।”
“ভালো।”
অভিক ছবিটা টেবিলে রেখে দিল। “তোমাতে তুমিই আছো, নিশি। তোমাকে আমার মতো করার দরকার কী? তুমি তুমি থাকলেই তো হলো।”
নিশি কিছু বলল না।
তারপর হঠাৎ বলল, “তুমি যদি না থাকো?”
অভিকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“এই কথাটা কেন?”
“এমনি।”
“এমনি না।”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি তো আছি।”
“এখন আছ।”
অভিক জানালার দিকে তাকাল। “কাল কী হবে কে জানে?”
নিশির মুখটা শক্ত হয়ে গেল।
“ডাক্তারের কথাটা বলো।”
অভিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আরও কিছু পরীক্ষা করতে বলেছে।”
“কেন?”
“একটু সমস্যা ধরা পড়েছে।”
“কী সমস্যা?”
অভিক উত্তর দিল না।
নিশির গলা নিচু হয়ে এল। “তুমি আমাকে বলোনি?”
“ভয় পেয়ে যাবে।”
“আমি তোমার স্ত্রী। ভয় পাব কি না, সেটা আমি ঠিক করব।”
অভিক মাথা নিচু করল।
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।
তারপর নিশি ধীরে হাত বাড়িয়ে ছবিটা তুলে নিল। ছবির মেয়েটা তখনও হাসছে।
নিশি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই মেয়েটা তখন ভাবত, তোমার সঙ্গে সারাজীবন থাকবে।”
অভিক মৃদু হেসে বলল, “থাকবে।”
“যদি না পারে?”
অভিক তার দিকে তাকাল। “তাহলে?”
নিশি কোনো উত্তর দিল না।
রান্নাঘর থেকে দুটো কাপ এনে টেবিলে রাখল।
“চা বানিয়েছি।”
অভিক কাপটা হাতে নিল। “এত রাতে?”
“তাতে কী?”
দুজনেই চুপচাপ চা খেতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর নিশি তার কাঁধে মাথা রাখল। অভিক খুব আস্তে বলল, “এই তোমার মুখ—মহাকাশে দেখা পৃথিবীর মতো। দূর থেকে শান্ত। কাছে এলে বুঝি, এর ভেতরেই আমার কত জীবন জমে আছে।”
নিশি কিছু বলল না। তার চোখের পানি অভিকের শার্টে লেগে গেল। সে শুধু অভিকের হাতটা শক্ত করে ধরে রইল।
টেবিলের ওপর পুরোনো ছবিটা পড়ে ছিল। মোমবাতির আলোয় ছবির নিশি হাসছিল।
আর পাশে বসে থাকা নিশি, বহু বছর পর প্রথমবার, ছবিটার দিকে তাকিয়ে হাসতে পারছিল না।
চা ঠান্ডা হয়ে গেল।
কেউ কাপ সরাল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।