আমরা কি মানুষ, নাকি অ্যালগরিদম?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প । ১৩ নভেম্বর ২০২৫
অভিক একসময় ভাবত, প্রযুক্তি মানুষকে মুক্তি দিয়েছে।
যে জগতে ক্লান্ত শরীর আর থমকে যাওয়া সময়কে ডিজিটাল পর্দা নতুন করে বাঁচার সুযোগ দেয়—সেই জগতে সে বিশ্বাস করত, মানুষ কখনও হারাবে না।
কিন্তু আজকাল আয়নায় নিজের মুখ দেখলেই সে একটু থেমে যায়। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মন ক্লান্ত নয়—মন যেন ব্যস্ত, কোথাও এক অদৃশ্য নির্দেশ মানতে মানতে হাঁপিয়ে উঠছে।
অভিক সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেয়।
অ্যালার্মের পরেই স্ক্রিনে দেখা যায় নোটিফিকেশন—“তুমি হয়তো এটা পছন্দ করবে।”
সে কখনও ভাবে না কে তাকে এত ভালো করে চেনে।
কখনোই ভাবেনি, কেউ তার পছন্দ-অপছন্দ, রাগ, আনন্দ, ভয়—সব কিছু সংখ্যায় মেপে ফেলেছে।
প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি স্ক্রল তার মানসিক নকশার অংশ হয়ে যাচ্ছে—
আর অভিক ভাবছে, সে নিজের ইচ্ছেতেই চলছে।
দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে সে ক্যাফেতে বসে। টেবিলে কফি, সামনে স্ক্রিনে রিল। অচেনা মানুষের মুখ, চেনা অনুভূতির ভান।
সে হাসে, কিন্তু বুঝতে পারে না কেন হাসছে।
সে ভালোবাসার ভিডিও দেখে “লাইক” দেয়, কিন্তু তার ভেতরে কোনো উষ্ণতা জাগে না। সব যেন সাজানো অনুভূতি—যেন মেশিন তাকে শিখিয়েছে কবে হাসতে হয়, কবে কাঁদতে।
এক রাতে, অভিক নিজের পুরনো ডায়েরি খুঁজে পায়। পাতায় পাতায় লেখা তার কিশোর বয়সের ভাবনা—
ভালোবাসা, হতাশা, স্বপ্ন আর ক্ষণিকের উন্মাদনা।
হাতের লেখায় ছিল এলোমেলোতা, অথচ তাতে ছিল হৃদয়ের স্পন্দন।
সে ভাবে—তখন তো সে কাউকে “লাইক” দিত না, “শেয়ার” করত না,
তবু সেই সময়ের প্রতিটি অনুভূতি সত্যি ছিল।
আজ তার অনুভূতিও আছে, কিন্তু সেগুলো প্রোগ্রাম করা—
ভয় মানে breaking news,
আনন্দ মানে notification,
আর ভালোবাসা মানে একটা অনলাইন ইমোজি।
অভিক বুঝতে পারে, সে এখন শুধু ভোক্তা নয়,
সে নিজেই এক পণ্য—অ্যালগরিদমের খেলার ঘুঁটি।
রাতের দিকে সে হাঁটে ছাদের ধারে, তারাভরা আকাশের নিচে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
কোনও মেশিন এখানে নেই, কোনও ডেটা ট্র্যাকার নেই।
এই নীরবতাই তার একমাত্র সত্য। সে মনে করে—যেদিন আমরা নিজের সঙ্গে কথা বলা ভুলে গেছি,
সেদিন থেকেই অ্যালগরিদম আমাদের আত্মাকে দখল করেছে।
মানুষ মানে তো কেবল যুক্তি নয়—মানুষ মানে অনুভব, ভুল করা, কান্না, এবং আবার নতুন করে বাঁচার চেষ্টা।
কিন্তু অভিক এখন দেখে, পৃথিবী ভরে গেছে হিসাব-নির্ভর সম্পর্ক আর মাপা হাসিতে।
সবাই মাপছে—লাইক, রিচ, ভিউ, অথচ কেউ আর মাপছে না অনুভবের গভীরতা।
সে ভাবে—আমরা কি সত্যিই মানুষ, নাকি শুধু অ্যালগরিদমের সুনিপুণ অনুলিপি?
যেখানে ভালোবাসাও এখন ডেটা,
আর কষ্টও কনটেন্ট।
তবু অভিক হাল ছাড়ে না।
সে ডায়েরি খুলে আবার লিখতে শুরু করে—
নিজের ভাষায়, নিজের ভুলে, নিজের অনুভূতিতে।
স্ক্রিনের বাইরের জীবনের জন্য এই লেখা তার এক নীরব প্রতিরোধ।
সে জানে, যতদিন শব্দের ভেতরে হৃদয়ের স্পন্দন থাকবে, যতদিন মানুষ নিজের বেদনা নিজের ভাষায় লিখতে পারবে, ততদিন কোনও অ্যালগরিদম মানুষকে জয় করতে পারবে না।
অভিক জানে, মানুষকে মেশিন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না—
কারণ অ্যালগরিদম ভাবতে পারে, কিন্তু অনুভব করতে পারে না।
আর যতদিন পৃথিবীতে “অনুভব” নামের এই অদ্ভুত শক্তি থাকবে, ততদিন মানুষ বেঁচে থাকবে—
হয়তো নীরবে, কিন্তু সত্যি
হয়ে।
#আমরা_কি_মানুষ_নাকি_অ্যালগরিদম
#অভিকের_ডায়েরি #ডিজিটাল_মানবতা #চিন্তার_স্বাধীনতা #মানবীয়_বোধ #প্রযুক্তির_ছায়ায় #নিজেকে_পুনরুদ্ধার
#অনুভবের_বিজয়
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।