ফিরে আসার ঠিকানা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৪ আগস্ট ২০২৬
সেদিন বিকেল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল। একটানা নয়, থেমে থেমে। কখনো জানালার কাচে ঝিরঝির শব্দ, আবার হঠাৎ সব চুপ। কিছুক্ষণ পর আকাশ যেন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে আবার বৃষ্টি নামিয়ে দিচ্ছিল। রান্নাঘর থেকে ভাতের গন্ধ আসছিল। চুলার ওপর ডাল ফুটছিল, ঢাকনার নিচে জমে থাকা বাষ্পে সেটি মাঝে মাঝে টুং করে কেঁপে উঠছিল।
নিশি জানালার পাশে বসে খোলা বইয়ের একই পাতার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। পড়া হচ্ছিল না। অভিক আজও ফিরতে দেরি করছে।
সকালে দুজনের ঝগড়া হয়েছিল। খুব বড় কোনো বিষয় নয়। সংসারের চেনা ঝগড়া। একটা কথা থেকে আরেকটা কথা, তারপর এমন কিছু কথা বেরিয়ে যাওয়া, যেগুলো কেউ আসলে বলতে চায়নি।
অভিক বের হওয়ার সময় বলেছিল, “তুমি সবকিছু নিয়ে এত ভাবো কেন?”
নিশি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “তুমি কিছু না ভেবেই সব করে ফেলো বলে।”
“সবসময় কি ভুল করি?”
“আমি তা বলিনি।”
“কিন্তু বলতে চেয়েছ।”
নিশি আর উত্তর দেয়নি।
দরজার কাছে গিয়ে অভিক একবার ফিরে তাকিয়েছিল। “রাতে কথা হবে।”
নিশি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
সন্ধ্যার পর একবার ফোন করেছিল সে। অভিক ধরেনি। কিছুক্ষণ পর একটা বার্তা এসেছিল—“কাজে আছি। ফিরতে দেরি হবে।”
তারপর আর কোনো কথা হয়নি।
রাত সাড়ে দশটার দিকে নিশি খাবার টেবিলে দুটো প্লেট সাজাল। নিজের প্লেট সামনে রেখেও খেতে পারল না। অভিকের প্লেটটা ঢেকে রাখল। ভাতটা একটু শুকিয়ে যাচ্ছিল। ঢাকনা তুলে অল্প পানি ছিটিয়ে আবার ঢেকে দিল।
রাত এগারোটার কিছু পরে দরজায় চাবির শব্দ হলো।
অভিক ঢুকল। জামা ভেজা। চুলের ডগা থেকে পানি পড়ছে।
নিশি কিছু বলল না।
অভিকও না।
ব্যাগটা রেখে বাথরুমে চলে গেল। ফিরে এসে টেবিলের খাবারের দিকে তাকিয়ে বলল, “খেয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
অভিক নিশির দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “মিথ্যা বলছ।”
নিশি মুখ ফিরিয়ে নিল।
অভিক চুপচাপ বসে খেতে শুরু করল। নিশি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। এত বছর একসঙ্গে থাকার পরও কখনো কখনো একই ঘরে থেকেও দুজন মানুষ কত দূরে চলে যেতে পারে।
খাওয়া শেষ করে অভিক হাত ধুয়ে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
“সকালের কথাটা নিয়ে রাগ করে আছ?”
“না।”
“আছ।”
নিশি এবার তাকাল। “তুমিও তো রাগ করেছিলে।”
“করেছিলাম।”
“তাহলে?”
অভিক একটু হেসে বলল, “আমি বেশি বলে ফেলেছি।”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমিও।”
“তাহলে হিসাব সমান।”
নিশি জানালার বাইরে তাকাল। “সবকিছুর হিসাব হয়?”
অভিক এবার আর হাসল না।
“হয় না।”
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালার কাচ বেয়ে পানি নামছে। নিশি কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে খুব আস্তে বলল, “জানো, কখনো কখনো মনে হয় তোমার কাছে আমার অনেক ঋণ জমে গেছে।”
অভিক অবাক হয়ে তাকাল। “কীসের ঋণ?”
“জানি না।”
“তাহলে শোধ করবে কীভাবে?”
নিশি একটু হাসল। “দিনে দিনে ভুলেই যাব, ঋণ আছে।”
অভিক কিছু বলল না।
নিশি বলল, “আমার যা কিছু দেখা, সবকিছুর মধ্যে তোমার একটু করে দ্বিধা আছে। তুমি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কতবার ভাবো, কতবার থেমে যাও। এসব দেখতে দেখতে আমিও শিখেছি, সব কথা সঙ্গে সঙ্গে বলা যায় না।”
অভিক চায়ের কাপটা হাতে নিল। “আর কী শিখেছ?”
“কিছু কথা পাশে বসে থাকলেই বলা হয়ে যায়।”
অভিক তার দিকে তাকিয়ে রইল।
নিশি রান্নাঘর থেকে দুটো চায়ের কাপ এনে একটা তার হাতে দিল। নিজের কাপটা নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ দুজনের কেউ কথা বলল না।
তারপর নিশি বলল, “শোনো।”
“হুম?”
“তুমি যদি কোনোদিন খুব দূরে চলে যাও?”
অভিক কাপটা নামিয়ে রাখল। “কোথায় যাব?”
“জানি না। মানুষ তো সবসময় নিজের ইচ্ছেমতো থাকতে পারে না।”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ফিরে আসব।”
“সবাই কি ফিরে আসতে পারে?”
“আমি পারব।”
নিশি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
অভিক মৃদু হেসে বলল, “তুমি থাকলে পথ ভুললেও একটা ঠিকানা থাকে।”
নিশির চোখ ভিজে উঠল। সে মুখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
অভিক ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“তোমাকে একটা কথা দিই?”
নিশি কিছু বলল না।
“যত দূরেই যাই, যত রাগই হোক, যত ভুলই করি—ফিরে যাব।”
নিশি এবার তার দিকে তাকাল।
অভিক খুব আস্তে বলল, “ঠিক ফিরে যাব।”
বাইরে বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছিল।
নিশি কোনো উত্তর দিল না। শুধু হাত বাড়িয়ে অভিকের হাতটা ধরল।
অভিকও হাতটা শক্ত করে ধরল।
সেদিন তাদের আর কোনো শপথের প্রয়োজন হয়নি।
নিশি অভিকের হাত ছাড়ল না।
বাইরে বৃষ্টি পড়তেই থাকল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।