শেষ খাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
বাবা মারা যাওয়ার পর আলমারির নিচের তাকে পাওয়া খামটা তিন ভাইবোনের অনেক হিসাব বদলে দিয়েছিল।
যদিও সেই হিসাব টাকার ছিল না।
বাবা চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা দিন সুমন, মিতা আর রায়হানের কারও ঠিকমতো কিছু মনে থাকত না।
বাড়িটা আগের মতোই ছিল। বারান্দার কোণে বাবার কাঠের চেয়ারটা পড়ে আছে। চশমাটা এখনো টেবিলের ওপর। দেয়ালের ঘড়িটাও ঠিক সময়মতো চলছে।
শুধু মানুষটা নেই।
সকালে উঠে রায়হান এখনো অনেক সময় বাবার ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে। অভ্যাসটা যায়নি। তারপর মনে পড়ে, ঘরের ভেতর আর কেউ নেই।
কিন্তু শোক বেশিদিন মানুষের দৈনন্দিন হিসাব থামিয়ে রাখে না।
একসময় কথা উঠল বাড়ি নিয়ে। জমির কাগজ। ব্যাংকের টাকা। কে কী পাবে।
সুমন ঢাকায় চাকরি করে। সংসার আছে, ঋণ আছে। মিতা বিয়ের পর রাজশাহীতে থাকে। নিজের সংসারের পাশাপাশি বাবার খবরও রাখত। আর রায়হান এতদিন বাবার সঙ্গেই ছিল।
তিনজনেরই মনে হয়েছিল, তারা বাবার জন্য কম কিছু করেনি। সমস্যা হলো, প্রত্যেকের হিসাবটা আলাদা ছিল।
এক বিকেলে সুমন কাগজপত্র দেখতে দেখতে বলল, "বাড়িটার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। ঝুলিয়ে রেখে তো লাভ নেই।"
রায়হান চুপ করে ছিল। তারপর বলল, "বাবা তো মাত্র গেল। একটু সময় দিলে কী হতো?"
সুমন তাকাল। "সময় কি শুধু তোর জন্য আছে? আমারও তো কিছু দায়িত্ব আছে।"
কথাটা বলেই দুজনেই চুপ হয়ে গেল। কারণ তারা জানত, আসল কথা এটা না। আসল কথা জমি বা টাকা না। অনেকদিনের জমে থাকা কিছু অভিমান।
রায়হানের মনে ছিল, শেষ দুই বছর সে বাবাকে একা ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছে। রাতে জ্বর এলে পাশে বসেছে।
সুমনের মনে ছিল, সে নিজের সংসার চালিয়েও নিয়মিত বাবার জন্য টাকা পাঠিয়েছে।
মিতার মনে ছিল, দূরে থেকেও সে বাবার ওষুধ, প্রয়োজন, সব খোঁজ নিয়েছে।
কিন্তু কেউ কারও জায়গাটা বুঝতে চাইছিল না। সবাই শুধু নিজের কষ্টটা দেখছিল।
বাবার ঘরটা গোছাতে গিয়ে মিতা আলমারির নিচের তাকে একটা পুরোনো ফাইল পেল। কিছু কাগজের নিচে একটা সাদা খাম।
খামের ওপর লেখা, "আমার তিনজনের জন্য।"
তিনজনই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সুমন ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
ভেতরে বাবার হাতের লেখা।
"তোরা যখন এটা পড়বি, তখন আমি থাকব না।
জানি, আমার রেখে যাওয়া জিনিস নিয়ে তোদের হিসাব করতে হবে।
করিস। জীবনের প্রয়োজন আছে।
কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, তোদের মধ্যে যেন হিসাবটা না ঢুকে যায়।"
সুমন একটু থামল। ঘরের ভেতর শুধু কাগজের শব্দ।
চিঠিতে আরও লেখা ছিল,
"তোরা ছোট থাকতে একটা আম তিন ভাগ করে খেতিস।
কে বড় টুকরো পেল, সেটা নিয়ে ঝগড়া করতিস ঠিকই, কিন্তু বিকেলে আবার একসঙ্গে খেলতে নামতিস।
বড় হয়ে শুধু সেই জায়গাটাই হারিয়ে ফেলিস না।"
মিতা চোখ নামিয়ে বসে রইল। রায়হান জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। কেউ কিছু বলছিল না।
চিঠির শেষ দিকে বাবা লিখেছিলেন,
"বাড়ি যদি ভাগ করতে হয়, করিস।
টাকা যদি ভাগ করতে হয়, করিস।
কিন্তু এমন কিছু করিস না, যাতে তোদের একে অপরের দরজায় যেতে অস্বস্তি হয়।
আমার ভয় সম্পদ নিয়ে ছিল না।
আমার ভয় ছিল, তোরা যেন একে অপরকে হারিয়ে না ফেলিস।"
অনেকক্ষণ পর সুমন আস্তে করে বলল, "আমি হয়তো কথাটা অন্যভাবে বলতে পারতাম।"
রায়হান কিছু বলল না। শুধু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে দিল।
মিতা চোখ মুছতে মুছতে বলল, "বাবা শেষ পর্যন্তও আমাদের নিয়েই ভাবল।"
বাড়ির ভাগ শেষ পর্যন্ত হয়েছিল। যার যা প্রয়োজন, সে অনুযায়ী।
কিন্তু তার আগে তারা আরেকটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বছরে কয়েকটা দিন সবাই এই বাড়িতে আসবে। বাবার ঘরে বসবে। একসঙ্গে খাবে। যেভাবে ছোটবেলায় করত।
কয়েক মাস পর এক বিকেলে তিন ভাইবোন আবার বাবার ঘরে বসেছিল। দেয়ালে বাবার ছবি। সামনে সেই পুরোনো চেয়ার।
সুমন ছবিটার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, "বাবা থাকলে বলত, এত দেরিতে বুঝলি?"
তিনজনই হেসে ফেলল। হাসির ভেতর একটু কষ্ট ছিল। কিন্তু আগের মতো দূরত্ব ছিল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।