৭ ফেব্রুয়ারির ঘর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । মে ০৯, ২০২৬
অভিকের উদ্দেশে তার মায়ের লেখা—একটি চিঠি
অভিক,
ডাক্তার বলছিল তোর বুকের ব্যথা আবার উঠতে পারে।
রাতে হঠাৎ করে হাসপাতালে যেতে হয় নাকি এখন কমছে?
কাল এখানে এক ফালি তরমুজ দিছিল।
খাইতে পারি নাই।
তরমুজটা থালায় পড়ে ছিল অনেকক্ষণ। কেউ নেয়নি।আমি তাকিয়ে ছিলাম শুধু। মনে হচ্ছিল, জিনিসটা না খেলে হারিয়ে যাবে না কি।
তুই তরমুজ খুব পছন্দ করতি। তোর বাবা আনলে দৌড় দিয়া বরফ আনতি—“ঠান্ডা তরমুজ খাওয়ার মজা আলাদা”—এই কথা বারবার বলতি।
এখন সেই কথা মনে হলে একটু হাসি আসে, তারপর থেমে যায়।
এখানে ঠান্ডা কিছু খেতে দেয় না। আমারও এখন ঠান্ডা সইতে পারি না—ডাক্তাররা তাই কয়।
তোর কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা কেমন ঠান্ডা লাগে—এইটা ডাক্তারি না।
ঠিকমতো খাস তো? এইসব নতুন নতুন খাবারের ভিড়ে তরমুজের কথা মনে পড়ে নাকি আর?
এখানে আমার এক বছর হইল।
সময় কেমনে গেল—খেয়াল করি নাই।
কিছু মানুষ পাইছি। নাম দিয়া কি হবে—সবাই মা, এইটাই বড় কথা।
তোর হার্টের পর ডাক্তার গরুর মাংস খেতে মানা করছিল।
সেই থেইকা আমিও খাই না।
পান খাওয়া ছেড়ে দিছি।
তোর বৌ বলত—ছাগলের মতো খাই।
তখন হাসছিলাম, এখন হাসি আসে না।
ডায়াবেটিসের ওষুধ লাগে এখনও।
কখনো দেরি হয়, তবু দেয়।
ওষুধের লগে কেউ মুখ কালা করে না—এইটাই ফারাক।
পা মাঝে মাঝে ঝিম ধরে।
একটা মাইয়া আসে, পা টিপে দেয়।
একদিন দেখি কাঁদতেছে।
কয়—তার মায়ের পা নাকি কোনোদিন টিপা হয় নাই।
তার হাত কাঁপে, কিন্তু থামে না।
মনে হয় সে নিজের মায়ের কাছে কিছু একটা ফেরত দিতে চাইতেছে—যেটা দেরি হয়ে গেছে।
অনেক খাবার সময় সবার আগে দিয়া যায়।
নাতনীদের একটা ছবি আনছি। ছবিটা হাতে ধরি, চুমু দেই।
কখনো অনেকক্ষণ শুধু তাকিয়ে থাকি—কেউ কিছু বলে না।
ওদের কাছে যাইতে মানা ছিল।
আমার গা লাগলে নাকি অসুখ হবে।
ছবিটা থাক—এইটাই যথেষ্ট।
৭ ফেব্রুয়ারি তুই আমাকে এখানে দিয়া গেলি।
দিনটা মনে আছে—তোর জন্মদিন।
ভালো গিফট দিছস।
এই জায়গার নামটা সুন্দর।
শুনলে ভালো লাগে।
ভেতরের কথা আলাদা।
এখানে যারা থাকে, তারা আগে খুব দরকারি ছিল—কমপক্ষে নিজের কাছে। এখন কেউ ডাকে না।
আমার কিছু জমি-জায়গা আছে।
কাগজটা রেডি রাখতেছি—তোর মেয়েদের নামে দিব।
কবে মরব ঠিক নাই।
তোকে ফোন দিতে বলছিলাম, কয়—নম্বর ব্যস্ত।
বুঝি।
নম্বর বদলাইছিস।
তাই চিঠি লিখালাম।
পৌঁছাবে কি না—জানি না।
অনেকদিন তোর মুখে “মা” ডাক শুনি না।
একবার ডাকবি, শুধু একবার।
তারপর আর কিছু চাব না।
ইতি
একসময়ের মা
৭ ফেব্রুয়ারির ঘর থেকে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।