তবুও তুমি…
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
সাহিত্যিক শ্রদ্ধাঞ্জলি | মার্চ ৮, ২০২৬
তাকে বর্ণনা করতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে জীবনানন্দ দাশের সেই চরণ:
"চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য..."
জীবনের এক মুহূর্তে আমি তার অন্ধকার বিদিশার মাঝে নিজেকে হারিয়েছিলাম। সেই হারানোতেই আজও আমি নিজেকে খুঁজে ফিরি।
প্রথম দিকে তাকে বুঝতে পারিনি। মনে হতো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উৎসর্গ (১৯১৪) কাব্যের রহস্যময়ী নারী যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে:
"তোমারে পাছে সহজে বুঝি তাই কি
এত লীলার ছল,
বাহিরে যবে হাসির ছটা ভিতরে থাকে আঁখির জল।
বুঝি গো আমি,
বুঝি গো তব ছলনা।"
কবিতার মতোই আমি বুঝেছিলাম তার চোখের জল, তার ছল, তার মনের কথা।
প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল সে একজন সাধারণ নারী। কিন্তু ধীরে ধীরে তার সান্নিধ্যে আসার পর, তার চরিত্রের এক এক অধ্যায় উন্মোচিত হতে লাগল।
আমার কাছে মনে হলো সে যেন পথের পাঁচালীর “দুর্গা”—চঞ্চল কিশোরী কন্যার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তার চঞ্চলতা, হাস্যময়তা, সকলের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা আমাকে অভিভূত করেছে।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমি তার মধ্যে এক নারীর ভিন্ন চরিত্র খুঁজে পেয়েছি। কখনো সে ধরা দেয় মানব জমিনের “তৃষা”র মতো। অন্যরা যেমন কোমল ও শান্ত, সে ছিল কঠিন ও দৃপ্ত। স্বতন্ত্র ও লক্ষ্যভিমুখী। মানুষের দ্বন্দ্ব, সমাজের প্রতিকূলতা—কিছুই তাকে দমাতে পারেনি।
সে জীবনকে সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছে। তাই তাকে মানব জমিনের “তৃষা” বললে ভুল হবে না।
এরপর আমি তার মধ্যে সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন উপন্যাসের “দীপা” খুঁজে পেয়েছি—সাহসী, স্বতন্ত্র, অন্ধকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। নিজের ভাগ্য জয় করেছে, পড়াশুনা করেছে। কাছের মানুষ, এমনকি স্বজনদের ঘৃণা, শত্রুতা—কিছুই তাকে ভেঙে দিতে পারেনি।
কাছের কেউ পাশে ছিল না; দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলার সময় কেউ কাঁধ বাড়ায়নি। সুযোগ ছিল এগিয়ে নেওয়ার, তবু সে রেখেছে অদম্য মনোবল। সাধারণের মাঝেই অসাধারণ হয়ে ওঠা।
তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা নাটকীয়তা—দারিদ্র্য, সামাজিক হেয়তা, হতাশা, হিংসা—সবের মধ্যেও সে নিজস্ব স্বকীয়তায় পূর্ণ। লোভ, ঘৃণা, প্রেম, উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত পিষ্ট করেছে সময়।
ঠিক তখন আমি তার মধ্যে “প্রফুল্ল” খুঁজে পেয়েছি। সাধারণ হতে হতে অসাধারণ হয়ে ওঠা, আত্মমর্যাদার অধিকারিণী। সমাজের নানাবিধ নিগ্রহেও তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ।
তার চরিত্রের আরও ভিন্ন রূপ আমি দেখেছি—‘জয়গুন’, ‘রাজলক্ষী’, ‘জমিলা’, ‘মুনা’। সাহসী, দৃঢ়, দয়াময়ী, আবেগময়, শান্ত ও কোমল। প্রতিটি রূপে সে সমাজের প্রতিকূলতা ও জীবনের কঠিন পরীক্ষা জয় করেছে।
আজও সে একা লড়ছে—আমার সঙ্গে। দরিদ্রতা, রোগ, সামাজিক চ্যালেঞ্জ—সবের মুখোমুখি।
আমার কাছে দিতে পারার কিছু নেই। তবু বলি, যদি কখনও ক্লান্ত লাগে, যদি চলার পথে অবলম্বন লাগে, আমি আছি—শুধু তোমার জন্য। জীবনের শেষ দৃশ্য পর্যন্ত।
বিঃদ্রঃ:
বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষ্যে সকল নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্নেহ রইলো। আজকের লেখা আমার স্ত্রীকে নিয়েই—যার জন্য আমার কিছুই যথেষ্ট নয়, তবু হৃদয় ভরা শ্রদ্ধা।
#তবুও_তুমি #নারী_দিবস #শক্তিশালী_নারী #প্রেরণা #ভালোবাসা #অসাধারণ_নারী #জীবন_সংগ্রাম #সাহসী_নারী #মোহাম্মদ_জাহিদ_হোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।