৬২৫ রুপির বার্গার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ৬ জুন, ২০২৬
অনেকে মনে করেন আমি শুধু কষ্টের গল্পই লিখি। আসলে তা না। জীবনে কষ্ট যেমন আছে, তেমনি কিছু ঘটনা আছে যেগুলো মনে পড়লে আজও নিজের ওপরই হাসি পায়।
এই ঘটনাটা তেমনই একটা।
সাল ২০০৯। প্রথমবার বিমানে উঠব।
চিকিৎসার জন্য ভারত গিয়েছিলাম। বেনাপোল দিয়ে কলকাতায় পৌঁছেছি। গিয়ে দেখি দুর্গাপূজা চলছে। পুরো শহর উৎসবের মধ্যে। রাস্তা ভরা মানুষ, আলো, প্যান্ডেল। কিন্তু আমার তখন সেসব দেখার মতো অবস্থা নেই। চিকিৎসা নিয়েই ব্যস্ত।
সমস্যা হলো, ছুটির কারণে অনেক কিছু বন্ধ। হাসপাতালের নিয়মিত কাজও সীমিত। হোটেলে বসে বসে সময় কাটাচ্ছি।
এর মধ্যে কয়েকজন বলল, হার্টের চিকিৎসার জন্য চেন্নাই গেলে ভালো হবে। পরে একজন ডাক্তারও একই কথা বললেন।
চেন্নাই যেতে হবে। ট্রেনে গেলে প্রায় তিন দিন। তিন দিন ট্রেনে বসে থাকার কথা ভাবতেই বিরক্ত লাগল। তাই ঠিক করলাম বিমানে যাব। জীবনে প্রথমবার।
সন্ধ্যায় একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে ঢুকে বললাম, চেন্নাইয়ের একটা টিকিট লাগবে। ভদ্রলোক কম্পিউটারে কী যেন করতে লাগলেন। আমি পাশে বসে আছি। হঠাৎ দেখি টিকিটের দাম উঠছে, নামছে, আবার উঠছে।
আমার কাছে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল। আমি তো ভাবতাম ভাড়া মানে ভাড়া। বাসের মতো, ট্রেনের মতো। পরে বুঝলাম বিমানের হিসাব আলাদা।
শেষ পর্যন্ত একটা টিকিট হলো। পরদিন সকালেই ফ্লাইট।
সারারাত ঠিকমতো ঘুম হলো না। চিকিৎসার চিন্তা ছিল, আবার বিমানে ওঠার উত্তেজনাও ছিল।
বিমানবন্দরে গিয়ে বোর্ডিং পাস নেওয়ার সময় জিজ্ঞেস করল, কোন সিট চাই।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
— সামনের দিকে দিন।
কেন বললাম, নিজেও জানি না। মনে হয়েছিল সামনের সিট মানেই ভালো সিট।
বিমানে উঠে দেখি সামনে কোনো দৃশ্য নেই। সোজা একটা দেয়াল।
তখন বুঝলাম নিজের বুদ্ধির ফল।
আমার দুপাশে দুইজন তামিল ভদ্রলোক বসেছিলেন। নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। আমি চুপচাপ বসে আছি।
তারপর বিমান চলা শুরু করল। কিছুক্ষণ পর এমন শব্দ হলো যে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল। মনে হলো বিশাল একটা মেশিন পুরো শক্তিতে চলছে। কয়েক সেকেন্ড পরে বিমান আকাশে উঠল।
আমি একটু স্বস্তি পেলাম। ভাবলাম, এবার সব ঠিক।
কিন্তু আসল ঘটনা তখনও বাকি।
বিমানে ওঠার আগে আমার ধারণা ছিল, বিমানের সব খাবার ফ্রি। কোথা থেকে এই ধারণা পেয়েছিলাম জানি না।
একটু পরে বিমানবালা খাবারের ট্রলি নিয়ে এলেন। বার্গার আছে, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আছে, কোক আছে। আমি একদম বড় বার্গারটাই নিলাম। সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। পরে আবার কোকও নিলাম।
বেশ আরাম করে খাচ্ছি।
খেতে খেতে হঠাৎ খেয়াল করলাম, আশপাশের কেউ কিছু নিচ্ছে না। একটু অবাক হলাম। তারপর ভাবলাম, হয়তো সবাই খেয়ে এসেছে। বিষয়টা নিয়ে আর মাথা ঘামালাম না।
এর মধ্যে পাশের সিট থেকে একটা তামিল পত্রিকা হাতে নিলাম। ভাষা বুঝি না, তবু এমনভাবে ধরে আছি যেন খুব মন দিয়ে পড়ছি।
হঠাৎ পাশের ভদ্রলোক হেসে বললেন,
— দাদা, কাগজটা উল্টো।
আমি সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকাটা ভাঁজ করে রেখে দিলাম। মনে হলো, আর একটু হলে মাটির নিচে ঢুকে যাই।
কিন্তু না। আরও বাকি ছিল।
কিছুক্ষণ পরে বিমানবালা আবার এলেন। হাতে একটা ছোট্ট কাগজ।
আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
— স্যার, আপনার বিল।
আমি অবাক।
— বিল?
— জি, খাবারের বিল।
কাগজটা হাতে নিয়ে দেখি ৬২৫ রুপি।
৬২৫ রুপি দেখে কয়েক সেকেন্ড আমি শুধু কাগজটার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।
বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর কোক মিলে ৬২৫ রুপি!
পরে জানলাম ডোমেস্টিক ফ্লাইটে খাবার কিনে খেতে হয়।
টাকা দিলাম। আর মনে মনে নিজেকেই কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিলাম।
চিকিৎসা শেষে সাত দিন পর আবার বিমানে উঠলাম। এবার নিজেকে বেশ অভিজ্ঞ যাত্রী মনে হচ্ছিল।
বিমান আকাশে ওঠার কিছুক্ষণ পরে বিমানবালা এক বোতল পানি এগিয়ে দিলেন।
আমি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লাম।
না ভাই, এবার আর না।
আগের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট।
পানি নিলাম না।
কিছুক্ষণ পর দেখি আশপাশের সবাই নিশ্চিন্তে পানি খাচ্ছে।
বিমান নামার আগে পাশের একজন জিজ্ঞেস করলেন,
— পানি নিলেন না কেন?
আমি আস্তে করে বললাম,
— এর জন্য টাকা লাগবে না তো?
লোকটা হেসে ফেললেন।
— না, এটা ফ্রি।
আমি আর কোনো কথা বলিনি।
প্রথমবার বিমানে উঠে ফ্রি ভেবে খাবার খেয়ে বিল দিয়েছিলাম।
দ্বিতীয়বার বিলের ভয়ে ফ্রি পানিটাও খাইনি।
আজ এত বছর পরও ৬২৫ রুপির সেই বার্গারের কথা মনে পড়লে হাসি পায়।
আর উল্টো করে ধরা সেই তামিল পত্রিকার কথাও।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।