আরেকটু জীবন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
আত্মকথনধর্মী। ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কখনো কখনো মানুষ দীর্ঘ জীবন চায় না। শুধু চায়, আরেকটু সময়। আরেকটি সকাল। সন্তানের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকা। মায়ের পাশে বসে দুটো কথা বলা। বাবার জন্য হাত তুলে দোয়া করা। আরেকবার সিজদায় গিয়ে নিজের সমস্ত ভয় আর অসহায়ত্ব আল্লাহর কাছে রেখে আসা।
মৃত্যুর সঙ্গে আমার পরিচয় আজকের নয়। ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম হার্ট অ্যাটাকের পর আমি লাইফ সাপোর্টে ছিলাম।
তখন জীবনটা নিজের হাতে ছিল না। শরীরের ভেতরে কী ঘটছে, সেটাও বোঝার মতো অবস্থায় ছিলাম না। শুধু জানতাম, আমাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। এরপর বিদেশের হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা। শেষ পর্যন্ত হার্টে রিং বসানো হলো। আমি ফিরে এলাম। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো জীবন একটু স্বাভাবিক হবে।
কিন্তু ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক হলো। এবার ওপেন হার্ট অপারেশন করতে হলো ইব্রাহিম কার্ডিয়াকে। বাইপাস করা হলো, দুটি নালি বসানো হলো। বাইপাসের পর দুটো বছর মোটামুটি ভালোই ছিলাম।
মনে হয়েছিল, এবার বোধহয় পার পেয়ে গেলাম। কিন্তু ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৃতীয়বার হার্ট অ্যাটাক হলো।
এইবার আঘাতটা ছিল অনেক গভীর। হার্টের প্রায় ৬০ শতাংশ কোষ নষ্ট হয়ে গেল। হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা নেমে এলো ৩০ শতাংশে নিচে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিএজি করার পর জানা গেল, ব্লকের পরিমাণ ৯৫ শতাংশ।
একসময় এসব সংখ্যা আমার কাছে শুধু চিকিৎসার রিপোর্ট ছিল।
পরে বুঝেছি, কিছু সংখ্যা কাগজে লেখা থাকে ঠিকই, কিন্তু তার ওজন বহন করতে হয় শরীর দিয়ে। সুস্থ থাকার সময় আমরা কত কিছুই না স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। সহজে হাঁটা, রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, একটু দূর পথ হেঁটে যাওয়া, সন্তানের সঙ্গে বসে গল্প করা—এসবের কোনোটাকেই তখন বিশেষ কিছু মনে হয় না। অসুস্থতা এসে বোঝায়, স্বাভাবিক জীবনটাই আসলে কত বড় নিয়ামত।
এর মধ্যেই ২৭ অক্টোবর ২০২২ সালে আমার বাবা চলে গেলেন। বাবাকে হারানোর ব্যথাটা আমার অন্যসব কষ্টের থেকে আলাদা।
হার্টের অসুখ আমাকে শরীরের দুর্বলতা বুঝিয়েছে। বাবার মৃত্যু আমাকে বুঝিয়েছে, কিছু শূন্যতা শরীরে নয়, মানুষের ভেতরে তৈরি হয়।
বাবা ছিলেন আমার জীবনের বড় একটি আশ্রয়। তাঁর পাশে থাকাটা এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে, তাঁর অনুপস্থিতি কেমন হতে পারে, তা কখনো ভাবিনি।
তিনি চলে যাওয়ার পর ঘরের অনেক কিছুই আগের মতো ছিল, শুধু ঘরটা আর আগের মতো লাগত না।
আজও বাবাকে মনে পড়ে। তাঁর জন্য দোয়া করি। আর নিজের জীবনটার দিকে তাকালে মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষ আসলে কত অল্প সময়ের অতিথি।
চিকিৎসক আমার শরীরের অবস্থা বলতে পারেন। পরীক্ষার রিপোর্ট বলতে পারে কোথায় কতটা ক্ষতি হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ঝুঁকির কথা জানাতে পারে। এসব আমি অস্বীকার করি না। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার চেষ্টা করি।
কিন্তু আমার জীবনের শেষ দিনটি কোনো রিপোর্টে লেখা নেই। আমার আয়ুর শেষ সিদ্ধান্তও মানুষের হাতে নয়। সেটা আমার রবের হাতে। এই বিশ্বাসটা আমাকে ভেতর থেকে ধরে রাখে।
আমি সবসময় শক্ত থাকি না। ভয় পাই। কখনো শরীরের অবস্থা দেখে দুশ্চিন্তা হয়। কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি। কখনো মনে হয়, আর কতটা পথ যেতে পারব? তারপর সন্তানের মুখ মনে পড়ে।
একটি সন্তান তার বাবার হার্টের পাম্পিং কত শতাংশ, সেটা বোঝে না। ৯৫ শতাংশ ব্লক কী, সেটাও বোঝে না। সে শুধু জানে—বাবা পাশে থাকলে তার পৃথিবীটা একটু নিরাপদ। এই বিশ্বাসের কাছে দাঁড়িয়ে আমি কীভাবে সহজে হাল ছেড়ে দিই?
তাই যতটা পারি, চেষ্টা করি। আজ আগের মতো হাঁটতে না পারলে ধীরে হাঁটি। বেশি কিছু করতে না পারলে কম করি। শরীর যখন থামতে বলে, তখন বিশ্রাম নিই। কিন্তু মনকে বলি—এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
কারণ বেঁচে থাকা মানে শুধু অনেক বছর পাওয়া নয়। কখনো কখনো পাওয়া অল্প সময়টুকুর মধ্যেই জীবনের আসল অর্থ খুঁজে নিতে হয়।
এখন আমার খুব বেশি কিছু চাওয়ার নেই। আমি পৃথিবী জয় করতে চাই না। বড় কোনো সম্পদের হিসাবও চাই না। শুধু চাই, যতদিন আল্লাহ আমাকে রাখবেন, ততদিন যেন আমার বেঁচে থাকাটা কারও জন্য বোঝা না হয়ে আশ্রয় হতে পারে।
সন্তানের মাথায় হাত রাখতে পারি। মায়ের পাশে থাকতে পারি। বাবার জন্য দোয়া করতে পারি। নিজের ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা চাইতে পারি। আর এমন কিছু ভালো কাজ করে যেতে পারি, যার কথা আমার অনুপস্থিতিতেও কেউ মনে রাখবে।
সামনে কতটা সময় আছে, আমি জানি না। হয়তো অনেকটা। হয়তো খুব অল্প। এই হিসাব আমার হাতে নেই। আমার হাতে আছে শুধু আজ।
তাই আজও আল্লাহর কাছে আমার চাওয়া খুব সামান্য,
হে আল্লাহ, যদি আমার জন্য আরও সময় লেখা থাকে, আমাকে আরেকটু জীবন দাও।
দিন শুধু বাড়িয়ে দিও না; সেই দিনগুলোকে অর্থপূর্ণ করে দিও। আমাকে আমার সন্তানদের জন্য ভালো বাবা হওয়ার সুযোগ দিও। আমার ভুলগুলো ক্ষমা করো। আমার বাবার কবরকে শান্তিতে রেখো।
আর যেদিন সত্যিই তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার সময় হবে, সেদিন যেন মনে কোনো বড় আফসোস না থাকে।
আমি যেন বলতে পারি,
ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু চেষ্টা থামাইনি।
অনেকবার ভেঙেছি, কিন্তু তোমার দরজা থেকে সরে যাইনি।
মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, তবু জীবনকে ভালোবাসতে ভুলিনি।
আজও যখন সন্তান কাছে এসে আমাকে ডাকে, আমি কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। সে জানে না তার বাবা কতটা অসুস্থ। সে শুধু জানে,
বাবা এখনো আছে।
আর সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়, আমার আজকের জন্য যতটুকু জীবন দরকার ছিল, আল্লাহ আমাকে ঠিক ততটুকুই দিয়েছেন।
তবু মনে মনে বলি,
আরেকটু।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।