ফেরার ঠিকানা
(জীবন, একাকিত্ব ও আশ্রয়ের খোঁজ)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৩ অক্টোবর ২০২৬
বয়স আটাশ। চাকরি আছে, মাসের শেষে বেতন আসে, নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারে। আত্মীয়স্বজনের চোখে রাফি এখন প্রতিষ্ঠিত মানুষ। অথচ মাঝেমধ্যে অফিস থেকে ফেরার পথে তার ইচ্ছে করে, কেউ ফোন করে জিজ্ঞেস করুক, “কোথায় আছিস? কখন ফিরবি?”
ছোটবেলায় মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেন। স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলেই বলতেন, “এত দেরি হলো কেন?”
রাফি বিরক্ত হয়ে উত্তর দিত, “একটু খেলেছি, মা। এত চিন্তা করো কেন?”
মা তখন বলতেন, “বড় হলে বুঝবি।”
রাফির বাবা মারা গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি। সেই দিনটার পর মা যেন আরও বেশি করে ছেলেকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। রাফি কোথাও গেলে বারবার ফোন করতেন, রাতে ফিরতে দেরি হলে জানালার পর্দা সরিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলে মায়ের ফোন দেখে বিরক্ত হতো রাফি। কখনো ফোন ধরত না। পরে বাড়ি ফিরে বলত, “আমি কি ছোট বাচ্চা? বারবার ফোন করতে হবে কেন?”
একদিন রাগের মাথায় বলে ফেলেছিল, “তোমার এই অতিরিক্ত চিন্তার জন্যই আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমাকে নিজের মতো থাকতে দাও।”
মা চুপ করে ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা নামিয়ে রেখেছিলেন। রাফিরও খারাপ লেগেছিল, কিন্তু ক্ষমা চায়নি। ভেবেছিল, মা তো মা-ই। কিছুক্ষণ রাগ করবেন, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।
চাকরি নিয়ে ঢাকায় আসার পর প্রথম দিকে মা প্রায় প্রতিদিন ফোন করতেন। খেয়েছে কি না জানতে চাইতেন, কখনো বলতেন, বাড়ির পাশের দোকানে তার পছন্দের বিস্কুট এসেছে।
রাফি ছোট ছোট উত্তর দিত।
“হ্যাঁ, খেয়েছি।”
“এখন ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব।”
ধীরে ধীরে মায়ের ফোন কমে গেল। রাফি মনে মনে স্বস্তি পেয়েছিল।
এক শুক্রবার বাড়ি গিয়ে দেখল, মা আগের চেয়ে অনেক শুকিয়ে গেছেন। তবু ছেলেকে দেখে সেই পুরোনো প্রশ্নটাই করলেন, “খেয়েছিস?”
রাফি ব্যাগ নামিয়ে বলল, “মা, আমি এখন আর ছোট নেই। নিজের খেয়াল রাখতে পারি।”
মা হেসে বললেন, “তা তো জানি।”
পরের মাসে মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। জ্বরের পর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে রাফি বাড়ি ছুটে গেল। হাসপাতালে মায়ের হাত ধরে বসেছিল অনেকক্ষণ।
চোখ খুলে মা জিজ্ঞেস করলেন, “কাজ ফেলে এলি?”
“তুমি এসব কথা বলো না তো।”
মা ছেলের হাতটা একটু শক্ত করে ধরেছিলেন।
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর মা আর আগের মতো ফোন করতেন না। হয়তো বুঝেছিলেন, ছেলে বড় হয়েছে, বারবার খোঁজ নেওয়াটা তার পছন্দ নয়। রাফি ফোন করলে কথা বলতেন, তবে নিজে থেকে বেশি কিছু জানতে চাইতেন না।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে রাফির মনটা খুব খারাপ ছিল। কাজ নষ্ট হয়েছে, বসের কাছে কথা শুনতে হয়েছে। হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ল। ফোন করে বলতে ইচ্ছে হলো, “মা, আজকে খুব খারাপ একটা দিন গেল।”
মা ফোন ধরতেই জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে?”
“কিছু না। এমনি ফোন দিলাম।”
“ভালো করেছিস। খেয়েছিস?”
রাফি চেয়েছিল, মা আরও কিছুক্ষণ কথা বলুন। গলার স্বর শুনে জিজ্ঞেস করুন, কিছু হয়েছে কি না। কিন্তু সে নিজেও কিছু বলল না।
“আচ্ছা মা, রাখি। পরে কথা বলব।”
“আচ্ছা, বাবা।”
কয়েক মাস পর মা আবার অসুস্থ হলেন। এবার রাফি পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে গেল।
বাড়িতে ঢুকে সে দেখল, মায়ের চশমাটা টেবিলে, পাশে আধখোলা ওষুধের বাক্স। রান্নাঘরের তাকে তার পছন্দের বিস্কুটের একটা প্যাকেট পড়ে আছে।
রাতে সবাই চলে যাওয়ার পর মায়ের ঘরে বসে পুরোনো একটা ছবি হাতে নিল রাফি। ছবিতে সে ছোট্ট শিশু, মায়ের কোলে বসে শাড়ির আঁচল মুঠো করে ধরে আছে।
তার চোখ ভিজে উঠল।
মায়ের নম্বরটা এখনো ফোনে আছে। মাঝে মাঝে খুলে তাকিয়ে থাকে। বলতে ইচ্ছে করে, “মা, আজকে মনটা ভালো নেই। একটু কথা বলবে?”
তারপর মনে পড়ে, ওপাশে আর কেউ ফোন ধরবে না।
কোনো কোনো সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দরজার তালা খুলতে খুলতে তার মনে হয়, কেউ যদি ভেতর থেকে দরজাটা খুলে দিত! কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, “এত দেরি হলো কেন?”
সেদিন হয়তো সে বিরক্ত হতো না। ব্যাগ নামিয়ে বলত, “মা, আজকে রাস্তায় খুব জ্যাম ছিল। তুমি খেয়েছ?”
এক রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফিরে মায়ের ছবিটা টেবিলে রাখল রাফি। তারপর ফোনে মায়ের নম্বর খুলে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
ফোনটা নামিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। পাশের বাড়ি থেকে কারও গলা ভেসে এল, “দরজাটা খুলে দাও, ও এসেছে।”
রাফি জানালা বন্ধ করে মায়ের ছবিটার পাশে এসে বসল।
“মা, আমি বাড়ি ফিরেছি,” সে আস্তে করে বলল।
ঘরে আর কোনো শব্দ হলো না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।