নীরব রাত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ২২ মে, ২০২৬
আমরা কি কখনও গভীর রাতের সেই অদ্ভুত নীরবতার ভেতর দাঁড়িয়ে থেকেছি—যে নীরবতা আসলে পুরোপুরি নীরব নয়?
সেই নীরবতায় দূরে কোথাও কুকুর ডাকে। কোনো পুরোনো মোটরসাইকেল গলি পেরিয়ে যায়। বিদ্যুতের তারে বাতাস ঘষা খেয়ে ক্ষীণ শব্দ তোলে। তবু সব মিলিয়ে মনে হয় শহর যেন নিজের ভেতরে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।
সেদিন রাতটা তেমনই ছিল।
ডিসেম্বরের শেষ। বাতাসে পাতলা কুয়াশা। বাসস্ট্যান্ডের পাশের চায়ের দোকানগুলো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল একটা দোকানের টিনের শাটার অর্ধেক নামানো। ভেতরে ম্লান আলো জ্বলছে। পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের কেটলির গায়ে জমে থাকা চায়ের দাগ পর্যন্ত সেই আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
রাফি সেখানে বসে ছিল।
দোকানদার তাকে তাড়ায়নি। হয়তো লোকটা বুঝেছিল—রাত যত বাড়ে, কিছু মানুষ তত ধীরে বাড়ি ফেরে। কারণ বাড়ি মানেই সবসময় আশ্রয় নয়। কখনও কখনও সেটা শুধু একটা ঘর, যেখানে মানুষ শরীর নিয়ে ফেরে, মন নিয়ে না।
চায়ের কাপের শেষ অংশ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। রাফি খেয়াল করেনি। তার দৃষ্টি ছিল রাস্তার ওপারের পুরোনো বাড়িটার দিকে।
দোতলার বাম পাশের ঘরটায় এখনও একটা হলুদ বাতি জ্বলছিল। পুরো ঘর আলোকিত করে না, বরং ছায়াগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
দোকানদার গ্লাস ধুতে ধুতে বলল,
— “ওই বাড়িটার দিকে এত তাকিয়ে থাকেন কেন?”
রাফি হালকা হেসে বলল,
— “এমনিই।”
এই “এমনিই” শব্দটার ভেতর মানুষ সাধারণত অনেক কিছু লুকিয়ে রাখে। অসমাপ্ত সম্পর্ক, পুরোনো অনুশোচনা, কিংবা এমন কিছু স্মৃতি, যেগুলোকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া যায় না।
রাফি আবার তাকাল বাড়িটার দিকে।
একসময় ওই বারান্দায় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে গান গাইত। খুব নিচু গলায়। যেন গানগুলো অন্য কাউকে নয়, নিজেকেই শোনাচ্ছে।
মেয়েটার নাম ছিল নীলা।
পরিচয়টা খুব সাধারণ ছিল। এক বর্ষার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সিঁড়িতে দেখা। নীলার হাতে ভেজা ছাতা আর কয়েকটা বই। একটা বইয়ের ভেতর থেকে বাসের টিকিট পড়ে গিয়েছিল। রাফি সেটা তুলে দিয়েছিল। ব্যস, গল্পের শুরু। নীলা কম কথা বলত।
কিন্তু তার পাশে থাকলে মনে হতো পৃথিবীর গতি একটু ধীর হয়েছে। রাফি তখন অস্থির বয়স পার করছিল—ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, নিজের জন্য একটা জায়গা তৈরি করার চাপ। নীলা সম্ভবত সেই বিশৃঙ্খলার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধরনের স্থিরতা ছিল।
সব সম্পর্ক প্রেমে গড়ে ওঠে না। কিছু সম্পর্ক মানুষের ভেতরের অস্থিরতাকে সাময়িকভাবে শান্ত করে বলেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তারপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল।
নীলার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সংসারের চাপ বাড়ল। সন্ধ্যার পর গান শোনা যেত কম। রাফি কয়েকবার ভেবেছিল বাড়িটার সামনে দিয়ে যাবে। একদিন গিয়েওছিল। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। ভেতর থেকে কারও কাশির শব্দ ভেসে আসছিল। ডাকতে গিয়েও ডাকেনি।
পরে একসময় গান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।
রাফি বহুবার বলতে চেয়েছিল,
“আমি আছি।”
কিন্তু এই বাক্যটা বলা যত সহজ শোনায়, তত সহজ নয়। কারণ “আমি আছি” মানে কখনও কখনও দায়িত্ব নেওয়া। আর মানুষ প্রায়ই ভয় পায় এমন প্রতিশ্রুতিকে, যেটা হয়তো রাখতে পারবে না।
সে চুপ ছিল।
ভাবছিল, সময় হয়তো একটা সমাধান বের করবে। পরে বুঝেছিল, সময় খুব কম জিনিস মেরামত করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সময় শুধু মানুষকে অন্যরকম করে ফেলে।
একদিন খবর এল, নীলার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
খবরটা রাফি অন্য কারও মুখে শুনেছিল। সে কোনো নাটকীয় দৃশ্য তৈরি করেনি। শুধু সেদিন গভীর রাতে এই একই দোকানে এসে বসেছিল।
অনেক বছর কেটে গেছে এরপর।
নীলা এখন কোথায় আছে, রাফি জানে না। হয়তো অন্য কোনো শহরে থাকে। হয়তো সন্তানের স্কুলব্যাগ গুছিয়ে দেয় ভোরবেলা। হয়তো মাঝরাতে বৃষ্টি নামলে এখনও কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। এর বেশি আমরা জানি না।
রাত আরও গভীর হলো।
দূরে একটা রিকশা ধীরে চলে গেল। ঘণ্টার শব্দটা কয়েক সেকেন্ড বাতাসে ভাসল, তারপর কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল। রাফি কাপের তলানিতে জমে থাকা চায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
দোকানদার বলল,
— “বাসায় যাবেন না?”
রাফি একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— “আপনি কখনও রাতের নীরবতা দেখেছেন?”
লোকটা হেসে ফেলল।
— “নীরবতা আবার দেখা যায় নাকি?”
রাফি রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর আস্তে বলল,
— “হুম। যায়।”
একটু থেমে আবার বলল,
— “যখন ঘরে ফেরার ইচ্ছা করে না।”
হঠাৎ বাতাস উঠল।
দোতলার হলুদ আলোটা নিভে গেল। বাড়িটা সঙ্গে সঙ্গে আরও নিঃসঙ্গ দেখাতে লাগল।
রাফি ধীরে উঠে দাঁড়াল। টেবিলে কিছু টাকা রেখে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
দূর থেকে তাকে খুব একা লাগছিল।
যদিও পুরোপুরি একা মানুষ সম্ভবত কেউই নয়। আমরা প্রত্যেকে কিছু পুরোনো রাত, কিছু না-বলা বাক্য, আর কয়েকজন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে সঙ্গে নিয়েই হাঁটি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।