পরিচয়পত্র
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ০২-০৯-২০২৬
ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়ে অভিক প্রথমে বাসায় ফিরল না। দুপুরের রোদ তখন মাথার ওপর। শার্টের কলার ঘামে ভিজে গেছে। হাতে কালো ফাইলটা—ভেতরে কয়েক কপি জীবনবৃত্তান্ত, একটা কলম আর আগের অফিসের শেষ বেতন সনদ।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তিনশো পঁচিশ টাকা। এক মুহূর্ত ভেবে রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে বসে পড়ল। —এক কাপ চা দেন। চা-ওয়ালা গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ভাই, বিস্কুট দেব?
অভিক মাথা নাড়ল।
চায়ের গ্লাস হাতে নিয়ে সে ইন্টারভিউর কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করল। “আগের চাকরি কেন ছেড়েছেন?”
প্রশ্নটা খুব সহজ ছিল। কিন্তু অভিক উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গিয়েছিল। সে বলতে পারেনি, বারো বছর কাজ করার পর কোম্পানি তাকে ছাড়িয়ে দিয়েছে। বলেছিল, খরচ কমাতে হবে।
অভিক তখনও ভেবেছিল, এই শহরে বারো বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা চাকরি পাওয়া কঠিন হবে না। আজ তৃতীয় মাস চলছে।
চা শেষ করে সে টাকা দিল। চা-ওয়ালা পাঁচ টাকা ফেরত দিল। কয়েনটা হাতে নিয়ে অভিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর পকেটে রেখে উঠে পড়ল।
বাসায় ফিরে দরজা খুলতেই নিশি বলল,
কেমন হলো?
অভিক ফাইলটা টেবিলে রেখে বলল,
হয়নি।
কীভাবে বুঝলে?
বুঝেছি।
নিশি আর প্রশ্ন করল না। রান্নাঘরে গিয়ে ভাত বেড়ে আনল। অভিক খেতে বসে দু-এক লোকমার পর প্লেটটা সরিয়ে রাখল।
খাবি না?
ইচ্ছে করছে না।
নিশি এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
তোমার কোনো কিছুরই তো ইচ্ছে করছে না।
অভিক চুপ করে রইল।
চাকরি হয়নি, ঠিক আছে। আবার চেষ্টা করো। কিন্তু সারাদিন ঘরে বসে থেকে কী হবে?
চেষ্টা করছি।
কোথায়?
অভিক এবারও কোনো উত্তর দিল না।
নিশি বলল,
তুমি সারাদিন এই জানালার পাশে বসে থাকলে আমি আর কতদিন তোমাকে দেখতে আসব?
অভিক মাথা তুলল।
তুমি না এলেও পারো। নিশি চুপ করে গেল।
তারপর প্লেটটা সরিয়ে নিয়ে বলল,
ঠিক আছে।
সেদিন সে বেশ তাড়াতাড়ি চলে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর অভিক অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। ফোনটা কয়েকবার হাতে নিল, আবার রেখে দিল। চাকরি হারানোর পর সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছিল একটা সাধারণ প্রশ্ন—“কী করেন?” প্রথম দিকে অভিক সুন্দর করে উত্তর দিত, “ফাইন্যান্সে ছিলাম।” তারপর ধীরে ধীরে উত্তর ছোট হয়ে গেল, “চাকরি খুঁজছি।” শেষ দিকে প্রশ্নটা এড়ানোর জন্য সে মানুষজনের সঙ্গে দেখাই করা বন্ধ করে দিল। পুরনো সহকর্মীরা ফোন করলে ধরত না। বন্ধুরা দেখা করতে চাইলে বলত, “ব্যস্ত আছি।” আসলে সে কোথাও ব্যস্ত ছিল না। শুধু নিজের বেকার মুখটা কাউকে দেখাতে চাইত না।
একদিন পুরনো অফিসের এক সহকর্মী ফোন করেছিল। অভিক ফোনটা বাজতে দিয়ে পাশে রেখে দিয়েছিল। স্ক্রিনে নামটা জ্বলছিল। তারপর নিভে গেল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল, কলটা আর আসছে না।
এক বিকেলে আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে পুরনো একটা ব্যাগ পেল। ব্যাগটা খুলতেই পরিচয়পত্রটা বেরিয়ে এল। ছবিতে তার বয়স কম। চুল ছোট। মুখে আত্মবিশ্বাসী একটা ভাব। নিচে লেখা—সিনিয়র এক্সিকিউটিভ।
অভিক কার্ডটা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় এখনকার মানুষটা তাকে ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখছে। সে ছবিটার দিকে আবার তাকাল। পদবি চলে গেছে। অফিস চলে গেছে। কিন্তু ছবির মানুষটা তো সে-ই।
কার্ডটা হাতে নিয়ে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর টেবিলে বসে ল্যাপটপ খুলল। বারো বছরের অভিজ্ঞতাগুলো এক এক করে লিখতে গিয়ে তার মনে হলো, এত বছর সে শুধু একটা পদে কাজ করেনি। কাজের ভেতর আরও অনেক কিছু শিখেছে, যেগুলোর কোনো পরিচয়পত্র হয় না। সেদিন রাতেই সে তিনটা প্রতিষ্ঠানে জীবনবৃত্তান্ত পাঠাল। পরদিন আরও দুটো।
দুই সপ্তাহ পর একটা ছোট প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ হলো। বেতন আগের চেয়ে কম। অফিসও অনেক দূরে। তবু অভিক রাজি হয়ে গেল।
প্রথম দিন অফিসে যাওয়ার আগে পুরনো পরিচয়পত্রটা সে বের করেছিল। অনেকক্ষণ হাতে নিয়ে থেকে আবার ব্যাগে রেখে দিল। নতুন অফিসে তার জন্য নতুন একটা কার্ড বানানো হবে। কী লেখা থাকবে, সেটা সে জানত না।
কয়েক মাস পর তারা নদীর ধারে দাঁড়িয়েছিল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। নিশি সামনে হাঁটছিল, অভিক একটু পেছনে। হঠাৎ নিশি ফিরে তাকাল।
এত পেছনে কেন?
অভিক হেসে বলল,
আসছি।
সে হাঁটা বাড়াল। নিশির পাশে গিয়ে তার হাত ধরল।
ভেজা মাটির ওপর দুজনের পায়ের ছাপ পাশাপাশি পড়তে লাগল। পেছন থেকে নদীর পানি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।