বাবার পুরোনো ঘড়ি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৭ জুন, ২০২৬
বাবার সবচেয়ে প্রিয় ঘড়িটা বিক্রি করার দিনই অভিক প্রথমবার বাবাকে অসহায় দেখেছিল। কথাটা হয়তো বাড়াবাড়ি শোনাবে, কিন্তু সেদিনই।
ঘড়িটা খুব দামী ছিল না। পুরোনো একটা হাতঘড়ি, ডায়ালে কোম্পানির নামটা প্রায় মুছে গেছে। চামড়ার স্ট্র্যাপটা অনেক আগেই ছিঁড়ে গিয়েছিল—বাবা নিজেই সুই-সুতা দিয়ে সেলাই করে পরতেন। কাঁচেও লম্বা একটা আঁচড়।
তবু বাবা বাইরে বেরোনোর আগে ঘড়িটা হাতে না পরে বের হতেন না। যেন সময় দেখার চেয়ে অভ্যাসটা জরুরি।
একদিন অভিক বলেছিল, “নতুন একটা কিনে ফেলো না?”
বাবা হেসেছিলেন। “এটা তোর দাদার দেওয়া।”
এর বেশি কিছু বলেননি। বলেননি যে দাদা যেদিন প্রথম বেতন পেয়েছিলেন, সেদিন কিনেছিলেন।
অনেক বছর পরে সেই ঘড়িটাই আলমারি থেকে বের করলেন। তখন তিনি অসুস্থ। কারখানার কাজে যেতে পারছেন না তিন সপ্তাহ। ঘরে চালের ড্রামে তলায় সামান্য, ওষুধের স্লিপটা টেবিলে পড়ে আছে।
বাবা ঘড়িটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। কাঁটাটা টিকটিক করছে, কিন্তু স্লো। তারপর বললেন, “চল, একটু বেরোব।”
বাজারের ভেতরের ছোট্ট একটা ঘড়ির দোকান। কাঁচের শোকেসে নতুন ঘড়ি, দেয়ালে লটকানো সেকেন্ড-হ্যান্ড। বাবা ঘড়িটা কাউন্টারের ওপর রাখলেন। শব্দটা হালকা।
দোকানদার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখল। কাঁচে আঙুল বোলাল। “বেশি দাম হবে না। মেশিন পুরোনো, পার্টস পাওয়া যায় না।”
বাবা শুধু মাথা নাড়লেন। “যা হয় দেন।”
অভিক বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল। বাবা কাউকে দেখছিলেন না। চোখ ছিল ঘড়িটার ডায়ালে। সেকেন্ডের কাঁটাটা তখনো ঘুরছিল।
টাকা নিয়ে বেরিয়ে প্রথমে ফার্মেসিতে গেলেন। প্রেসক্রিপশন মিলিয়ে ওষুধ কিনলেন। পাঁচ দিনের। তারপর চাল, মসুর ডাল, দুটো আলু, একটা লাউ। পলিথিনের ব্যাগটা হাতে ঝুলছে।
ফেরার পথে অভিক আস্তে করে বলল, “ঘড়িটা না বিক্রি করলেও পারতে।”
বাবা হাঁটতে হাঁটতেই বললেন, “আবার কিনে নেওয়া যাবে।”
একটু থামলেন। গলির মোড়ে একটা কুকুর শুয়ে ছিল। তারপর খুব আস্তে বললেন, “তুই না খেয়ে থাকলে সেটা আর ফেরত পাব না।”
অভিক আর কোনো কথা বলেনি। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে আলো জ্বলে উঠল তখন।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অভ্যাসমতো বাবার হাতের দিকে তাকিয়েছিল। কবজিটা খালি। চামড়ায় হালকা দাগ, যেখানে এত বছর ঘড়ি ছিল। অদ্ভুত লাগছিল। ফাঁকা লাগছিল।
বাবা যেন ইচ্ছে করেই হাতটা লুঙ্গির কোচায় গুঁজে রাখলেন। চায়ের কাপ তুললেন বাঁ হাতে।
বহু বছর পরে অভিকের নিজেরও ছেলে হলো। নাম রেখেছে রোদ্দুর।
একদিন ছেলেটা পুরোনো অ্যালবাম দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, “এইটা দাদু?”
অভিক ছবিটার দিকে তাকাল। উঠোনে তোলা ছবি। বাবা হাসছেন। রোদ পড়েছে মুখে। হাতে সেই ঘড়িটা, স্ট্র্যাপে সেলাই স্পষ্ট।
অভিক ছবিটা অনেকক্ষণ হাতে ধরে রইল। আঙুলের ছাপ পড়ল কাঁচে। তারপর খুব যত্ন করে আবার অ্যালবামের প্লাস্টিকের পকেটে ঢুকিয়ে দিল।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চালে শব্দ হচ্ছে। টুপটাপ। টুপটাপ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।