রুদ্রের গর্জন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
ভোরের দিকে বিমানবন্দরটা যেন অর্ধেক জেগে ওঠা মানুষের মতো।
আলো আসছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়। কাচের দেয়ালে ছায়া পড়ছে, ট্রলির চাকা ঘষছে মেঝেতে, কেউ চুপিচুপি কাঁদছে, কেউ জোর করে হাসছে। এই সবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল এসআই মাহমুদ। চোখে ঘুমের দাগ, তবু চোখ দুটো খোলা। পাশে তার জার্মান শেফার্ড রুদ্র। নামটা তার চেয়ে বেশি কাজ করে।
রুদ্র কখনো অকারণে থামে না।
থামলে বোঝা যায় সে কিছু শুনছে, গন্ধ পাচ্ছে, বা দেখছে—যেটা আমরা দেখি না।
সেদিন লাইনে একজন মহিলা।
কালো বোরকা, নতুন জুতো, হাতে ব্যাগ যেটা বেশ দামি মনে হয়। তিনটে বাচ্চা। সবচেয়ে ছোট মেয়েটা তার একদম পেছনে, খুব কাছে। মেয়েটার চোখে কিছু নেই। না ভয়, না আনন্দ, না কৌতূহল। শুধু একটা শূন্যতা, যেমনটা অনেকদিন ধরে ভয় পেয়ে পেয়ে চোখে জমে।
মহিলা বারবার ঘড়ি দেখছে।
আঙুল কাঁপছে। ঠোঁট শুকনো।
হঠাৎ রুদ্র থামল।
শরীর একদম সোজা। কান দুটো খাড়া। লেজ একদম নড়ছে না। মাহমুদ তার দিকে তাকাল। তার মুখে সেই ভাব যখন সে বোঝে—এবার আর ফাঁকি দেওয়া যাবে না।
মেয়েটা মহিলার পিঠে আঙুল দিয়ে টোকা দিল।
এক। দুই। তিন। চার। পাঁচ।
ঠিক পাঁচবার। খুব ধীরে। যেন কেউ শেখিয়ে দিয়েছে এই কাজটা।
রুদ্র গর্জন দিল।
একটা গভীর, ভারী, লম্বা গর্জন। বিমানবন্দরের সব আওয়াজ যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
মহিলা দৌড় দিতে চাইল।
পারল না। রুদ্র পথ আটকে দাঁড়াল। দাঁত বের করল, কিন্তু কামড়াল না। শুধু বলে দিল—আর চলবে না।
কাগজপত্র দেখতে গিয়ে হাত কাঁপছিল মহিলার।
পাসপোর্টগুলো ভুয়া। একটা ক্যাটালগ বেরোল ব্যাগ থেকে। ছবি, নাম, নম্বর। যেন দোকানের ক্যাটালগ। মানুষের নয়, জিনিসের।
ছোট মেয়েটির নাম লেখা ছিল আয়েশা।
কিন্তু তার গলায় লকেটে অন্য নাম—নীলা।
মাহমুদ মাটিতে বসল।
মেয়েটির চোখে চোখ রাখল।
“কী হয়েছে?”
নীলা অনেকক্ষণ চুপ। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“উনি বলেছিলেন মা’র কাছে নিয়ে যাবেন। কিন্তু যারা গেছে… তারা আর আসেনি।”
সেই একটা কথায় সব ভেঙে পড়ল।
মহিলা পরে স্বীকার করল। সে একা নয়। একটা চক্র। অনেক বছর ধরে।
রাতে উত্তরার একটা বাড়িতে অভিযান।
বেসমেন্টের দরজা ভাঙতেই গন্ধ এলো। কান্না, ঘাম, ভয়, পুরনো প্রস্রাবের গন্ধ।
অনেকগুলো বাচ্চা। কেউ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। কেউ হাঁটুতে মুখ গুঁজে। চোখে আর আলো নেই।
রুদ্র এক কোণে গিয়ে থামল।
নাক নিচু করে গন্ধ শুঁকল। তারপর হঠাৎ ছুটল।
বাইরে গাড়ির ইঞ্জিন চালু। কেউ পালাচ্ছে।
রুদ্র পৌঁছে গেল আগে। গাড়ির সামনে দাঁড়াল। ড্রাইভার লাফ দিয়ে নামল। দৌড়াতে গেল। রুদ্র তাকে মাটিতে ফেলে দিল। কামড়াল না জোরে। শুধু ধরে রাখল।
পরদিন সকালে থানার সামনে অনেক কান্না।
আর কিছু হাসি।
নীলা তার মা’র বুকে মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ সে ছুটে গেল রুদ্রের কাছে। দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। রুদ্র কিছু বলল না। শুধু লেজটা একটু নড়ল। চোখটা নরম।
মাহমুদ দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল।
টান দিল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভাবল—
যদি সেদিন রুদ্র থামত না,
যদি পাঁচটা টোকা কেউ না দেখত,
তাহলে আজ এই কান্নাগুলো আরও অনেকদিন চলত।
বিমানবন্দর আবার শুরু হয়ে গেল। লোকজন ছুটছে। কেউ স্বপ্ন নিয়ে, কেউ ভয় নিয়ে।
কিন্তু কোথাও, অন্ধকারের এক কোণে, রুদ্রের সেই গর্জনটা এখনো পড়ে আছে।
যেন বলছে—দেখো, কখনো কখনো নীরবতার মধ্যেও চিৎকার থাকে।
আর সবচেয়ে বড় রক্ষকটা হয়তো চার পায়ে হাঁটে।
#রুদ্রেরগর্জন #জার্মানশেফার্ড #নীরবনায়ক #শিশুপাচারবিরোধী #মানবতারগল্প
#বাংলাগল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।