অন্ধকারের আগে যে মানুষটা ছিল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প।মে ০৭, ২০২৬
সারাদিনের বৃষ্টিতে শহরটা আজ অদ্ভুত নিস্তব্ধ, আর অভিকের বুকের ভেতরটা তার চেয়েও বেশি।
বড় রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। মাঝে মাঝে জমে থাকা পানির ওপর চাকার শব্দ ভেসে আসে। অথচ হাসপাতালগুলোতে উল্টো দৃশ্য—স্ট্রেচারের শব্দ, জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষা, ভেজা কাপড়ে বসে থাকা মানুষ।
এই সন্ধ্যাতেই আবার চাপটা উঠল অভিকের বুকে।
কয়েক মাস আগে ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছিল। ডাক্তাররা বলেছিলেন, সময় লাগবে। তারপর শরীর মানিয়ে নেবে। কিন্তু বুকের মাঝখানের সেলাইয়ের জায়গাটা এখনও মাঝরাতে জ্বলে ওঠে। কখনও কখনও ধমনির ভেতর এমন টান পড়ে, যেন কেউ সরু তার পাকিয়ে ধরেছে।
আজকের কষ্ট অন্যরকম।
বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে দেয়ালে হাত রাখতে হলো। নিঃশ্বাস ছোট হয়ে আসছিল। কিছুক্ষণ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল অভিক। তারপর পাশের বাসার মামুন সাহেবকে ফোন দিল।
মামুন সাহেব ছাতা মাথায় দ্রুত চলে এলেন। মুখের দিকে তাকিয়েই কিছু বুঝেছিলেন সম্ভবত।
—“চলেন। দেরি করা ঠিক হবে না।”
প্রায় আধঘণ্টা পরে অ্যাম্বুলেন্স এলো। সরু গলির ভেতর নীল আলো ঘুরছিল। স্ট্রেচারের চাকায় ভেজা রাস্তায় টুকটুক শব্দ উঠছিল। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাসে হাসপাতালের করিডরের মতো একটা গন্ধ লেগে ছিল।
অ্যাম্বুলেন্স চলতে শুরু করল।
স্যালাইনের ঠান্ডা সূচটা হাতে নড়তেই বুকের ভেতর হালকা কেঁপে উঠল অভিক। ঠিক এমন এক বৃষ্টির রাতেই নিশিকে প্রথম ঘরে এনেছিল সে।
ভাড়া বাসার ছোট ঘর। দেয়ালের কোণে স্যাঁতসেঁতে দাগ। নতুন বিছানার চাদরে দোকানের কড়া গন্ধ তখনও লেগে ছিল।
নিশি চারপাশে তাকিয়ে হেসে বলেছিল,
—“ঘরটা ছোট… কিন্তু দেখবা, আস্তে আস্তে সব ঠিক হইয়া যাবে।”
নতুন সকাল, নতুন রাত, নতুন মানুষ—এমনকি চায়ের কাপ ধোয়ার শব্দটাও নতুন লাগত।
মায়ের ডাক। বাবার চুপচাপ আদর। বিকেলের আড্ডা।
তিন ভাই মিলে এক থালায় মাখা মুড়ি। শীতের রাতে এক লেপের নিচে গা ঘেঁষে শোয়া।
লোকাল বাসে ঝুলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরা। বৃষ্টির মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খালি গলায় গান ধরা। তখন মনে হতো, বুকের ভেতর কোনো সেলাই নেই।
একদিন নিশি বলেছিল,
—“এইটারে এখন থিকা মা ডাকবা। নিজের মানুষ ভাববা, ঠিকাছে?”
অভিক সত্যিই তা-ই করেছিল।
নিশির মাকে “মা” বলে ডেকেছিল। সংসারের সব দায়িত্ব নিজের মতো তুলে নিয়েছিল। নিশির আবদার, রাগ, মন খারাপ—সব ধীরে ধীরে তার কাজ হয়ে উঠেছিল।
তারপর ঘরে এলো দুই মেয়ে।
মেয়েদের স্কুল, জ্বর, বই, খেলনা—এসব নিয়েই দিন কেটে যেত। নিজের জন্য আলাদা করে কিছু ভাবার সময় ছিল না। মাস শেষে হিসাব মিলত না। নিজের জন্য একটা শার্ট কিনতেও ভাবতে হতো দুবার।
দুপুরে না খেয়ে অফিস করেছে কতদিন।
সেই টাকায় বাসায় কিছু নিয়ে ফিরেছে। মেয়েরা খুশি হয়েছে। নিশিও।
রাত করে বাসায় ফিরত অভিক। টেবিলে ঢাকা দেওয়া ভাত থাকত। পাশে ছোট্ট কাগজে লেখা—
“বড়টার গণিতটা দেখবা।”
নিচে কোনো নাম থাকত না।
আস্তে আস্তে ঘরে জিনিসপত্র বাড়ল। ফ্রিজ এলো। কাঠের আলমারি এলো। দেয়ালে নতুন রঙ লাগল।
রাতের খাবারের টেবিলে নিশি মোবাইলের দিকে তাকিয়ে হাসত। অভিক চুপচাপ প্লেটের ভাত নাড়ত।
তবু সবসময় নিশি একরকম ছিল না।
প্রথম হার্ট অ্যাটাকের পর এক রাতে চুপচাপ অভিকের ওষুধগুলো গুছিয়ে রেখেছিল সে। পানির গ্লাসটাও পাশে এনে দিয়েছিল। সকালে অবশ্য আবার আগের মতো দূরত্ব।
প্রথম হার্ট অ্যাটাকের দিনটার কথা এখনও পরিষ্কার।
সাদা আলো। মনিটরের শব্দ। বুকের ভেতর অসহ্য চাপ। ডাক্তাররা হার্টে রিং বসিয়েছিলেন। কোনোমতে বেঁচে ফিরেছিল অভিক।
সাত দিনের হাসপাতালে নিশি মাত্র দুবার এসেছিল।
তবু কাউকে দোষ দেয়নি অভিক।
ব্যস্ত ছিল হয়তো।
এক মাসও বিশ্রাম নেয়নি ঠিকমতো। আবার অফিসে যাওয়া শুরু করেছিল। শরীর চলত না, তবু সংসার থেমে থাকে না।
রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরেও বিশ্রাম মিলত না। কখনও বাজার, কখনও বিল, কখনও মেয়েদের পড়া।
আর নিশি তখন নিজের জগতে ব্যস্ত।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একদিন টাই বাঁধতে গিয়ে থেমে গিয়েছিল অভিক। কয়েক সেকেন্ড নিজের মুখটাই চিনতে পারেনি।
তবু সে টিকে ছিল।
মূলত ছোট মেয়েটার জন্য।
মেয়েটা ঘুমানোর সময় তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরত। ছোট্ট হাত দুটো বুকের ওপর পড়ে থাকত অনেকক্ষণ।
অ্যাম্বুলেন্স তখন দ্রুত এগিয়ে চলছে। সামনে জল জমে আছে। ওয়াইপারটা ঠিকমতো কাজ করছে না। ভেজা কাঁচের ওপারে লাল ব্রেকলাইটগুলো ঝাপসা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
ড্রাইভার বারবার হর্ন দিচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সটা একবার ডানে, একবার বাঁয়ে কাটছে। পাশে বসে মামুন সাহেব সামনের রড শক্ত করে ধরে আছেন।
চাপটা এবার আরও বাড়ল।
জীবনটা একসময় ভরা নদীর মতো ছিল। স্রোত ছিল। কোথাও পৌঁছানোর তাড়া ছিল। মা-বাবা, ভাই, স্ত্রী, সন্তান—সবাইকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল সে।
সে চোখ বন্ধ করল।
বৃষ্টির মাঠে গান ধরা ছেলেটাকে আবার একবার দেখতে পেল।
ঠিক তখনই সামনে একটা ট্রাক হঠাৎ বাঁক নিল।
ড্রাইভার জোরে ব্রেক চাপল।
এক মুহূর্তের জন্য সব আলো নিভে গেল বলে মনে হলো।
তারপর—
অন্ধকার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।