ভেতরের যুদ্ধ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প । জানুয়ারি ১২, ২০২৬
আরিফ জানত, তার মাথার ভেতরে যে কণ্ঠস্বর কথা বলে—ওটা বাস্তব নয়। ডাক্তার বলেছেন। ওষুধের কাগজে লেখা আছে। তবুও, সেই কণ্ঠস্বরটাই তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। কারণ ওটা কখনো তাকে ছেড়ে যায়নি।
রাত গভীর হলে, যখন পুরো বাড়ি নিঃশব্দ, কণ্ঠস্বর বলে—
“তুমি আজ খুব ক্লান্ত।”
আরিফ হালকা নিশ্বাস ছাড়ে।
“হ্যাঁ… আজ একটু বেশি।”
এটাই তার শ্বাস, তার বাঁচার শেষ হাতছানি।
দিনে মানুষ তাকায়। চোখে থাকে বিচার। বাসে, রাস্তায়, বাজারে—প্রতিটি চোখ যেন চুরি করে তার শান্তি। কিন্তু ওই কণ্ঠস্বর কখনো নির্যাতন দেয়নি। সে শুধু বলতে চেয়েছে—“আমি আছি, তুমি একা নও।”
আরিফ একসময় খুব সাধারণ ছিল। হাসত, গল্প করত, স্বপ্ন দেখত। তার ছোটবেলার বন্ধু মায়া—যার হাসি সারাক্ষণ ঘর ভরতো, এখন নেই। দুর্ঘটনা এক মুহূর্তে সব কেঁড়ে নিল। আরিফ একা হয়ে গেল।
কণ্ঠস্বর ফিরে এলো—মায়ার মতোই, ভাঙা, ক্লান্ত।
“দাদা…”
আরিফ জানত, সে বাস্তব নয়। কিন্তু তার হৃদয় চিৎকার করছিল, “এটাই আমার সবকিছু।”
ডাক্তার বললেন—সিজোফ্রেনিয়া।
ভুল, বিভ্রম, রাসায়নিক অসামঞ্জস্য।
কিন্তু আরিফ জানে—কণ্ঠস্বরটি রোগ নয়।
এটি ছিল ভেতরের ভাষা, যা বলছিল, “আমি বেঁচে থাকতে চাই।”
ওষুধ আসলো। কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে দুর্বল হতে লাগল।
প্রথমবার সে বুঝল—স্বাস্থ্য ফিরে আসছে, কিন্তু তার ভেতরের শেষ অবলম্বনও হারাতে শুরু করেছে।
একদিন পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে আরিফ একটা নোটবুক পেল। মায়ার হাতের লেখা। শেষ পাতায় লেখা—
“দাদা, যদি আমি কখনো না থাকি, তুমি একা হবে না। আমি তোমার ভেতরেই আছি।”
আরিফ কাঁদল। সে বুঝল—কণ্ঠস্বরটি রোগ ছিল না। এটি ছিল ভালোবাসা, শোক এবং বেঁচে থাকার চেষ্টার ভাষা।
আজ আর কণ্ঠস্বর নেই। আরিফ সুস্থ। সবাই বলে, সে স্বাভাবিক। কিন্তু তার চোখের জল বলে, সে আর আগের মতো নয়। তার ভেতরের যুদ্ধ কখনো শেষ হয়নি।
কখনো কখনো সকালবেলায়, যখন রোদ আসে এবং বাতাসে কুয়াশার ধোঁয়া ভেসে আসে, আরিফ মনে করে—মায়া এখনও তার ভেতরে আছেন। প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি পদক্ষেপে তার ভেতরের কণ্ঠস্বর স্পন্দিত হয়।
এটাই সিজোফ্রেনিয়ার বাস্তবতা। এটি শুধু রোগ নয়, এটি এক অব্যক্ত যুদ্ধ—যেখানে আমাদের নিজের মন, ভালোবাসা এবং শোক একসঙ্গে লড়াই করে।
যেদিন আরিফ কণ্ঠস্বরকে ফিসফিস করে বিদায় জানাল, সেই দিনই সে শিখল—মানসিক রোগ কখনো পুরোপুরি শিকড় কেটে দেয় না। কখনো কখনো এটি আমাদের ভেতরের ভালোবাসার সবচাইতে নিখুঁত রূপ।
তার চোখে জল আসছে। সে জানে—এই যুদ্ধে হার মানার মানে মৃত্যু নয়, হার মানার মানে বোঝাপড়া ও বাঁচার সাহসের জন্য নতুন শিক্ষা পাওয়া।
আরিফ আজও আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চোখে পড়ে শুধু নিজের প্রতিচ্ছবি। কোনো কণ্ঠস্বর নেই।
সে ফিসফিস করে বলে—
“মায়া, আমি ঠিক আছি।”
কেউ উত্তর দেয় না। কিন্তু আরিফ ভেঙে পড়ে না।
কারণ সে বুঝে গেছে—ভেতরের যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না, কিন্তু মনোবলই আমাদের বাঁচায়।
#ভেতরের_যুদ্ধ
#সিজোফ্রেনিয়া_গল্প
#মানসিক_স্বাস্থ্য
#হৃদয়স্পর্শী_গল্প
#অদৃশ্য_যুদ্ধ
#মানুষের_কণ্ঠ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।