অপমানের ভয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। মার্চ ২২, ২০২৬
মেহেদি ঘুম থেকে উঠে দেখল মা চেয়ারে পড়ে আছেন। মাথা একদিকে ঝুঁকে, মুখে কিছু লালা। টেবিলে দুই টাকা—গতকাল বাজার থেকে বাকি। মা বলেছিলেন রেখে দিতে। সে নিল না। কেন? মনে নেই। হয়তো লজ্জা, হয়তো অন্য কিছু—মায়ের চোখের মতো, যা জানতে চায় না, কিন্তু জেনে ফেলে।
বাইরে বের হল। জুতো পরতে গিয়ে দেখল তলায় ছিদ্র—বড় হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে জল ঢুকবে। কাঁধে ব্যাগ, হাতে কিছু নেই। টাকা নেই। কিন্তু থাকা যায় না ঘরে। মা জাগলে চোখের দিকে তাকাতে হবে—সেই চোখ, যা অনুরোধ করে না, কিন্তু পায়। সে দরজা খুলল, হাতল ঠান্ডা ছিল। বাইরে তেলের গন্ধ, পচা মাছের গন্ধ, সকালের বাজারের অবশিষ্ট।
ফুটপাতে একটা কুকুর গা ঘেঁষে গেল। লেজ নাড়ানো উচিত ছিল, নাড়াল না। মেহেদি তাকাল না। সামনে দোকান—চায়ের। দোকানদারকে চেনে। গত সপ্তাহে এসেছিল, দশ টাকা দিয়ে চা খেয়েছিল। দোকানদার তখন কিছু বলেন নি, কিন্তু চোখের কোণে কিছু ছিল—সহানুভূতি, অথবা নিজের ভয়। মেহেদি দেখেছিল, বুঝেছিল, ভুলতে চেয়েছিল।
"এক কাপ।"
দোকানদার ঢালতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠল। চা পড়ল জুতোর ধারে। গরম লাগল, কিন্তু মেহেদি কিছু বলল না। দোকানদার বলল, "দেখো নি?"—কেমন যেন ভাঙা গলা, নিজের হাতের দোষ ঢাকতে। মেহেদি দেখল জুতো। পুরানো। ছিদ্র। চা গরম, ছিদ্র দিয়ে ভেতরে যাওয়ার ভয়। বলল, "ঠিক আছে।" থামল। মনে হল কিছু বলা উচিত। বলল, "শীতকালে গরম লাগবে।" দোকানদার হাসল—কেমন যেন, মায়ের মতো নরম নয়, কিন্তু নরমের ভান। মুখ ঘুরাল, অন্যদিকে চেঁচালো। মেহেদি চুমুক দিল। চা তিক্ত। চিনি কম। ধোঁয়া চোখে লাগল, কি জ্বলা জ্বলা করছে। বুকের ভেতরও কিছু—ক্ষুধা নয়, অন্য কিছু। কি? মনে পড়ল স্কুলের দিন।
নতুন জামা। বাবার দোকান থেকে আনা। ট্যাগ ঝুলছে—দাম লেখা, স্পষ্ট। রাহুল হেসে বলেছিল, "বাবার দোকান নতুন?" কেউ জোরে হেসেছিল, কেউ চোখে। মেহেদি ট্যাগ ছিঁড়ে ফেলেছিল। চুপচাপ। জামা এখনো আছে কোথাও—পড়ে আছে, কিন্তু পরে না। ট্যাগের ছিদ্র—ছোট, কিন্তু আছে। সেই ছিদ্রের মতো কিছু ভেতরে আছে, বাইরে দেখা যায় না। চোয়াল শক্ত, হাত কাঁপে। কেন কাঁপে? জানে না। জানতে চায় না।
চা শেষ। দশ টাকা দিল—কোথায় পেল? মনে নেই। কালকের নাকি? দোকানদার নিল। কিছু বলল না। চোখে সেই কিছু—আগের মতো। দুজনেরই অস্বস্তি, দুজনেরই ছদ্মবেশ। মেহেদি বেরিয়ে গেল। একটা শিশু তাকালো। চোখে কৌতুহল, ভয় নেই—কেন? মেহেদি দেখল, চোখ নামালো। শিশুর ভয়হীনতা তার ভয় বাড়ায়, অথবা কমায়। বুঝতে পারল না। সেতুর নিচে গেল।
ছায়া। বাতাস হালকা, গাড়ির শব্দ দূরে। একটা পরিবার—বাবা, মা, ছেলে। ছেলেটি খেলছে। হঠাৎ তাকালো। বলল, "খাবার আছে তো?" মেহেদি বলল, "আছে।" মিথ্যা। ছেলেটি হাসল—কেমন যেন, মায়ের মতো নরম। মা তাকালো না। বাবা ফোনে। মেহেদি উঠল। হাত কাঁপছে। শক্তি আছে—ক্ষুদ্র, কিন্তু আছে। কি দিয়ে? জানে না। জানতে চায় না।
সন্ধ্যা। ঘরে। মা জেগে আছেন। "আজ খেয়েছিস?"—চোখে সেই অনুরোধ, যা বলে না, কিন্তু চায়। মেহেদি বলল, "হ্যাঁ।" মিথ্যা। মা কিছু বললেন না। হাত রাখলেন কাঁধে—গরম, শুকনো, পরিশ্রমের হাত। মেহেদি অনুভব করল কিছু নরম হলো। কি? জানে না। ভয় আছে—থাকবে। কিন্তু কিছু নরম হলো। শিশুর হাসির মতো, কিন্তু পুরোনো। মায়ের চোখের মতো, কিন্তু অন্য রকম।
রাতে খাতা বের করল। কলম কাঁপছে। লিখল: "ক্ষুধা সহ্য করা যায়। অপমান—অন্য রকম। চোখের ভাষা, হাতের স্পর্শ, ছোট্ট হাসি—এসবেই কিছু থাকে।" থামল। কি লিখবে আর? লিখল: "আজ লিখতে পারছি। কাল হয়তো পারব না। কিন্তু আজ—" থামল। কলম কাঁপছে, কিন্তু কাগজে নামছে। খাতা বন্ধ করল। মা ঘুমাচ্ছেন। কপালে হাত রাখল—গরম, নিঃশ্বাসে কিছু। বেরিয়ে গেল।
ফুটপাত ভরা। কেউ তাকায় নি। এমনই ভালো। কিন্তু এবার দাঁড়ালো। কেন? জানে না। একটা শিশু হাসছে দূরে—দেখল না। চোখ ছিল জুতোর দিকে। পুরানো। ছিদ্র। চায়ের দাগ। হাত কাঁপছে। কাপ ধরার শক্তি আছে—কেন? জানে না। হাঁটা শুরু করল। ধীরে। ভয় আছে। মনে আছে। কিন্তু হাঁটা যাচ্ছে। কেউ দেখছে না। এমনই ভালো। শিশুর হাসি মনে হলো—মায়ের মতো নরম, কিন্তু অন্য রকম। নতুন। হাঁটা যাচ্ছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।