দোলনচাঁপার বিকেল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২৩, ২০২৬
জীবনে এমন কিছু সময় আসে—হঠাৎ, কোনো ঘোষণা ছাড়াই—যখন বাইরে সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা দরজা বন্ধ হয়ে যায়। শব্দ হয় না, ধাক্কাও লাগে না, তবু বোঝা যায় কিছু একটা আর আগের জায়গায় নেই। সেই বন্ধ দরজার ওপাশে পড়ে থাকে কিছু দিন—রঙিন, এলোমেলো, অসমাপ্ত।
সেদিনের বিকেলটা ঠিক তেমনই ছিল।
শহরের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গাড়ির লাইন, মানুষের চলাফেরা, দোকানের আলো—সবই স্বাভাবিক। তবু মনে হচ্ছিল, আমি যেন এই দৃশ্যের ভেতরে নেই। দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু জড়িয়ে নেই। এই শহরের সাথে আমার সম্পর্কটা কোথায় যেন আলগা হয়ে গেছে।
আমার জায়গা ছিল অন্য কোথাও।
সেখানে বৈশাখী মেলা বসত। দোকানের সামনে কাগজের ঘুড়ি ঝুলে থাকত—লাল, নীল, কখনো এমন বেগুনি হয়ে যেত, যেটা না ঠিক বেগুনি, না কালো। বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, কিন্তু চোখ থাকত আকাশে ওঠার অপেক্ষায় থাকা ঘুড়িগুলোর দিকে। লাটাইটা হাতে পেলেই মনে হতো, আজ পারব—আজ আকাশটা একটু হলেও নিজের মতো করে টেনে নামাতে পারব।
দুই টাকায় চারটা সিঙ্গারা কিনে ভাগ করে খাওয়া—এইটুকুতেই বিকেল ভরে যেত। এক টাকার আইসক্রিম, দাঁতে ঠান্ডা লাগলেও থামা যেত না। তখন খুব বেশি কিছু লাগত না। যা ছিল, সেটাই যথেষ্ট মনে হতো।
এখন সব আছে। তবু যেন কিছু নেই।
লাটাই আছে, কিন্তু সুতো নেই। ঘুড়ি আছে, কিন্তু আকাশ নেই।
এই ভাবনার মধ্যেই খেয়াল করলাম—আমি একটা পুরোনো পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পথটা চেনা। এই আলপথ দিয়েই ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরতাম। দু’পাশে ঝোপঝাড়, মাঝখানে সরু রাস্তা। জায়গাটা প্রায় বদলায়নি—শুধু আমি বদলে গেছি।
কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই হাঁটা শুরু করলাম।
সন্ধ্যা নামছিল ধীরে। আকাশে লালচে আলো লেগে আছে। বাতাসে মিষ্টি একটা গন্ধ—মুড়ির মোয়া, বাতাসা, কদমা—যেন কোথাও মেলা শেষ হয়েছে, কিন্তু তার চিহ্ন পুরোপুরি মুছে যায়নি।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ল—একটা ছেলে দৌড়াচ্ছে। হাতে কাঠের চাকার ছোট গাড়ি। থামে না, পেছনে তাকায় না, শুধু দৌড়ায়।
আমি থেমে গেলাম।
দূরে একটা আলো জ্বলল—হারিকেন। টিমটিম করছে, কিন্তু চোখ টানে।
আমি সেদিকেই এগোলাম।
ছোট একটা ঘর। জানালার পাশে বসে কেউ পড়ছে। আলো কম, মুখ পরিষ্কার দেখা যায় না। তবু চিনতে ভুল হলো না।
দোলনচাঁপা।
নামটা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। কতদিন এই নামটা মনে আসেনি! ওর সাথে কোনো বড় গল্প ছিল না—না কোনো প্রতিশ্রুতি, না কোনো শেষ। তবু কিছু মুহূর্ত ছিল, যেগুলো তখন বুঝিনি, পরে ভুলতেও পারিনি।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকতেই আরেকটা স্মৃতি ভেসে উঠল। মা একটা ফর্দ দিয়েছিল বাজারে যাওয়ার সময়। কিছু জিনিস আনার কথা ছিল। কিন্তু আমি কিছুই আনিনি।
খালি হাতে ফিরেছিলাম। মায়ের মুখটা এখনও মনে আছে—কঠিন। বিরক্ত। চোখে জল ছিল না, কিন্তু গলার স্বরটা ভেঙে যাচ্ছিল।
ভয় পেয়েছিলাম। তবু সেদিনটা পুরো খারাপ ছিল না। কারণ সেইদিন আমি দোলনচাঁপাকে দেখেছিলাম।
এখন আবার দাঁড়িয়ে আছি। একই জায়গায়, একই আলোয়।
মনে হলো—এবার যদি কিছু বলি?
ঠিক তখনই টের পেলাম, কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
তাকালাম।
দোলনচাঁপা।
খুব কাছে। ওর হাতের কাঁচের চুড়িগুলো আস্তে নড়ল—টুক করে একটা শব্দ হলো। অকারণে সেই শব্দটাই কানে বেশি বাজল।
আমি কিছু বলতে গেলাম। গলা শুকিয়ে গেল।
ও তাকিয়ে রইল। কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো তাড়া নেই। শুধু তাকানো।
আমি চুপ। ও-ও।
আবার একবার চুড়ির শব্দ হলো—এবার আরও হালকা।
তারপর আর কিছু না।
সন্ধ্যা নেমে এলো পুরোপুরি। হারিকেনের আলো কাঁপতে কাঁপতে ছোট হয়ে গেল।
আমি হাঁটা শুরু করলাম। পেছনে তাকাইনি। তাকালে হয়তো দেখতাম—ছেলেটা এখনও দৌড়াচ্ছে, একইভাবে, থামেনি।
কিছু দূর যেতেই আলোটা নিভে গেল।
অন্ধকারটা খারাপ লাগল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।