যে মানুষটিকে সবাই তুচ্ছ করত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
মানবিক ছোটগল্প
১৯ অক্টোবর ২০২৬
বাজারের শেষ মাথায় বৃদ্ধ লোকটার ছোট্ট দোকান ছিল। দোকান বলতে টিনের চালের নিচে একটা কাঠের টেবিল, দুটো কাচের বয়াম আর পাশে রাখা পুরোনো টিনের বাক্স। বাক্সটার ঢাকনা একদিকে বেঁকে গিয়েছিল। বন্ধ করতে গেলে একটু চাপ দিতে হতো।
বৃদ্ধের দোকানে তেমন বিক্রি হতো না। কেউ এক মুঠো মুড়ি কিনত, কেউ কয়েকটা বিস্কুট। অনেকেই দাম না দিয়ে চলে যেত। বৃদ্ধ পেছন থেকে ডাকতেন না। শুধু খুচরা পয়সাগুলো গুনে বাক্সে রাখতেন, তারপর আবার নিজের কাজে মন দিতেন।
বাজারের অন্য দোকানিরা তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করত। কেউ বলত, লোকটা বোকা। কেউ বলত, এই বয়সে একটু বুদ্ধি না থাকলে এমনই হয়। বৃদ্ধ এসব শুনেও মুখ তুলতেন না। দুপুরের ফাঁকা সময়টায় তিনি পুরোনো খবরের কাগজ কেটে ঠোঙা বানাতেন। কাগজের ভাঁজগুলো নখ দিয়ে চেপে ঠিক করতেন, যাতে মুড়ি ভরলে নিচ দিয়ে পড়ে না যায়।
স্কুল ছুটির পর একটা ছেলে প্রায় প্রতিদিন তাঁর দোকানের সামনে এসে দাঁড়াত।
ছেলেটার নাম বৃদ্ধ জানতেন না। গায়ে সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট। ব্যাগটার এক পাশের সেলাই খুলে গিয়েছিল। সে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কাচের বয়ামের দিকে তাকিয়ে থাকত, কিন্তু কিছু চাইত না।
প্রথম দিন বৃদ্ধ নিজেই জিজ্ঞেস করেছিলেন,
— মুড়ি খাবি?
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নেড়েছিল।
বৃদ্ধ একটা কাগজের ঠোঙায় মুড়ি ভরে তার হাতে দিলেন। ছেলেটা ঠোঙাটা নিয়ে চলে যাওয়ার আগে পকেটে হাত দিয়েছিল।
— থাক, পরে দিস।
ছেলেটা আর কিছু না বলে রাস্তার ওপারে চলে গেল।
পরদিন আবার এল। তার পরদিনও। প্রতিবার একই ঘটনা। ছেলেটা এসে দাঁড়াত, বৃদ্ধ মুড়ি ভরে দিতেন। কোনো দিন সঙ্গে দুটো চানাচুর মিশিয়ে দিতেন, কোনো দিন একটা ছোট বিস্কুট। ছেলেটা খেতে খেতে চলে যেত।
একদিন পাশের দোকানের মালিক বলল,
— চাচা, আপনার দোকানে তো এখন দাতব্য কাজ চলে! এভাবে দিলে নিজের খাবার জুটবে কী করে?
বৃদ্ধ কাগজের একটা টুকরো ভাঁজ করতে করতে বললেন,
— হিসাব করে দিই।
লোকটা হেসে উঠল।
— কীসের হিসাব?
বৃদ্ধ আর উত্তর দিলেন না। ঠোঙাটার মুখটা ভালো করে চেপে দিলেন।
ছেলেটা কখনো টাকা দেয়নি। বৃদ্ধও আর চায়নি। তবে ছেলেটা এলে তিনি অন্য ক্রেতার জন্য রাখা মুড়ি থেকে তাকে দিতেন না। তার জন্য আলাদা করে একটু মুড়ি সরিয়ে রাখতেন। টিনের বাক্সের ওপর একটা খালি ঠোঙা চাপা দিয়ে রাখতেন, যাতে বাতাসে উড়ে না যায়।
একদিন ছেলেটা আসার পর বৃদ্ধ দেখলেন, তার চোখ লাল। শার্টের কলারটাও ভেজা। তিনি কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। মুড়ির সঙ্গে একটা বিস্কুট দিয়ে শুধু বললেন,
— আস্তে খাস। গলায় লাগবে।
ছেলেটা সেদিন দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে খেয়েছিল। যাওয়ার সময় ঠোঙাটা ভাঁজ করে ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে নিল।
বৃদ্ধের চোখে পড়েছিল, কিন্তু তিনি কিছু বলেননি।
এরপর কয়েক দিন ছেলেটা আসেনি।
প্রথম দিন বৃদ্ধ ভেবেছিলেন, হয়তো স্কুল ছুটি দেরিতে হয়েছে। দ্বিতীয় দিন রাস্তার দিকে কয়েকবার তাকিয়েছিলেন। তৃতীয় দিন মুড়ির বয়াম খুলে ঠোঙা বানাতে গিয়ে হাত থামিয়ে দিলেন।
পাশের দোকানি বলল,
— আপনার সেই খদ্দের আর আসে না কেন?
বৃদ্ধ বললেন,
— জানি না।
— টাকা বাকি রেখে পালিয়েছে নাকি?
বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকালেন। তারপর টেবিলের ওপর রাখা ঠোঙাগুলো গুছিয়ে রাখলেন।
বিকেলে দোকান বন্ধ করার আগে তিনি টিনের বাক্সটা খুললেন। ভেতরে কয়েকটা খুচরা পয়সা, একটা পুরোনো বোতামের টুকরো আর ভাঁজ করা কাগজের ঠোঙা ছিল। ঠোঙাগুলো তিনি সাধারণত ফেলে দিতেন না। কোনোটা আবার ব্যবহার করা যায়, কোনোটা কেবল ভাঁজের স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকে।
একটা ঠোঙার ভেতরের দিকে পেন্সিল দিয়ে লেখা ছিল—‘আজও এল।’
বৃদ্ধ লেখাটার ওপর আঙুল বুলিয়ে ঠোঙাটা আবার ভাঁজ করলেন। কে লিখেছিল, তা তাঁর মনে পড়ল না। হয়তো কোনো দিন নিজের হাতেই লিখেছিলেন।
পরদিন সকালে দোকান খোলার পর তিনি প্রথমেই একটা নতুন ঠোঙা বানালেন। তাতে মুড়ি ভরে টেবিলের এক পাশে রাখলেন। তারপর বয়ামগুলো মুছলেন, খুচরা পয়সা গুনলেন, রাস্তার ধুলো ঝাড়লেন।
দুপুরে স্কুল ছুটি হলো। একদল ছেলে হইচই করতে করতে বাজার পেরিয়ে গেল। বৃদ্ধ মাথা তুলে তাকালেন। সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট, কাঁধে ব্যাগ—অনেক ছেলেই ছিল। পরিচিত ছেলেটা ছিল না।
বিকেল নামার পরও ঠোঙাটা টেবিলের এক পাশে পড়ে রইল।
বৃদ্ধ সেটি খুললেন না। শুধু টিনের বাক্সের ঢাকনাটা বন্ধ করে ঠোঙাটার পাশে হাত রেখে বসে থাকলেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।