মনের অসুখ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৯ জুলাই, ২০২৬
শরীর খারাপ হলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই। কিন্তু মন খারাপ হলে কজন তার খোঁজ নিই?
প্রথমে অভিক কিছুই বুঝতে পারেনি।
দশ বছরের ঋদ্ধ ছিল গল্পের ভান্ডার। স্কুল থেকে ফিরেই এক নিশ্বাসে সারাদিনের সব কথা উগরে দিত। কোন বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া হলো, কে নতুন পেন্সিল আনল, স্যার ক্লাসে কী মজার কথা বললেন— কিছুই বাদ যেত না।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে ছেলেটা যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছে।
স্কুল থেকে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে যায়। খাওয়ার টেবিলে চুপচাপ বসে থাকে। বিকেলে মাঠে যাওয়ার নাম করলেই বলে, "ভালো লাগছে না।" মুখের সেই চেনা হাসিটাও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
অভিক ভেবেছিল, হয়তো পড়ার চাপ বেড়েছে।
একদিন জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে? শরীর খারাপ?"
ঋদ্ধ মাথা নেড়ে বলল, "না, আমি ঠিক আছি।"
অভিকও আর ঘাঁটাল না।
পরে সে বুঝেছিল, এই "আমি ঠিক আছি" কথাটার আড়ালেই অনেক সময় সবচেয়ে বড় না-বলা কষ্টগুলো লুকিয়ে থাকে।
কয়েকদিন পর স্কুলে অভিভাবক সভা।
সভা শেষে ক্লাস টিচার অভিককে আলাদা করে ডাকলেন। বললেন, "ঋদ্ধ আগের মতো নেই। ক্লাসে মনোযোগ কমে গেছে, বন্ধুদের সঙ্গেও মিশছে না। বাসায়ও কি এমন চুপচাপ থাকে?"
সেদিনই প্রথমবার অভিকের বুকের ভেতর সত্যিকারের দুশ্চিন্তা হলো।
রাতে সে ছেলের ঘরে গিয়ে বসল। ঋদ্ধ বই খুলে বসে আছে, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে চোখ বইয়ের পাতায়, মন অন্য কোথাও।
অভিক আস্তে করে বলল, "বাবা, সত্যি করে বলো তো, কী হয়েছে?"
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর খুব নিচু গলায় ঋদ্ধ বলল, "বাবা... আমার মনে হয় কেউ আমাকে পছন্দ করে না।"
অভিক থমকে গেল।
"এমন মনে হচ্ছে কেন?"
ঋদ্ধ চোখ নামিয়ে বলল, "স্কুলে কয়েকজন প্রায়ই আমাকে নিয়ে হাসে। আমি কিছু বলি না। বললে ওরা আরও বেশি হাসে।"
শেষ কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ ভিজে উঠল।
অভিকের মনে হলো, এতদিন সে ছেলের জ্বর, সর্দি, খাওয়া-দাওয়া, সবকিছুর যত্ন নিয়েছে, কিন্তু মনের ভেতরের জ্বরের খবরটা নেওয়াই হয়নি।
সে ঋদ্ধকে কাছে টেনে নিল। বলল, "এই কষ্টগুলো একা বয়ে বেড়াতে হবে না তোমাকে। যখনই মন খারাপ হবে, আমার কাছে চলে আসবে। আমরা দুজন বসে কথা বলব।"
পরদিন সকালেই অভিক স্কুলে গেল। ক্লাস টিচারের সঙ্গে সবটা খুলে বলল। অনুরোধ করল, বিষয়টা যেন গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়, প্রয়োজনে স্কুল কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করা হয়। বকাঝকা বা শাস্তি নয়, বোঝানোটাই যে আসল সমাধান— সেটাও বলল।
বাড়িতেও একটা ছোট পরিবর্তন এল।
রাতের পড়া শেষ হলে আধঘণ্টা শুধু গল্পের সময়। কোনো মোবাইল নেই, পড়ার চাপ নেই। সারাদিনে কী ভালো লাগল, কী খারাপ লাগল, কোন কথায় বুকটা ভারী হয়ে উঠল— সব বলা যাবে।
শুরুর দিকে ঋদ্ধ খুব কম কথা বলত।
তারপর ধীরে ধীরে সেই জমাট বাঁধা নীরবতা গলতে শুরু করল।
একদিন বলল, টিফিনে একা লেগেছিল।
আরেকদিন বলল, একটা অঙ্ক না পারায় খুব লজ্জা পেয়েছে।
অভিক সব কথার উত্তর দিত না। দিতে জানতও না। সে শুধু পাশে বসে বলত, "আমি বুঝতে পারছি। আমি আছি।"
এই দুটো বাক্যই যেন ওষুধের মতো কাজ করল।
মাস কয়েক পর ক্লাস টিচার নিজেই ফোন করলেন।
"ঋদ্ধ আবার আগের মতো হয়ে উঠছে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলছে, ক্লাসে হাত তুলে উত্তর দিচ্ছে।"
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অভিকের মনে হলো, সব কষ্টের ওষুধ হয়তো আমাদের হাতে থাকে না।
কিন্তু এমন একজন মানুষ হয়ে ওঠা যায়, যার কাছে একটা শিশুকে নিজের ভয়, কষ্ট আর চোখের জল লুকিয়ে রাখতে হয় না।
কারণ অনেক সময় মনের অসুখ বড় হয় নীরবতা থেকে।
আর তার সেরে ওঠা শুরু হয় একজন মন দিয়ে শোনা মানুষের কাছ থেকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।