ছবির বাইরের মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৬ জুন, ২০২৬
বিয়ের তিন বছর পর।
ঘর গুছাতে গিয়ে নিশি আলমারির ওপর থেকে পুরোনো অ্যালবামটা নামিয়েছিল।
অভিক পাশেই বসে ছিল।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটা ছবিতে এসে দুজনেই থেমে গেল।
মাঝখানে বর-কনে।
চারপাশে আত্মীয়স্বজন।
আর এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ।
ভেজা শার্ট।
মুখে ক্লান্তি।
পায়ে পুরোনো স্যান্ডেল।
অভিক ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
লোকটা কে?
নিশি একটু চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
উনি না থাকলে হয়তো আমাদের বিয়েটাই হতো না।
অভিক অবাক হয়ে তাকাল।
কীভাবে?
নিশি ছবিটার দিকে তাকিয়েই বলতে শুরু করল।
সেদিনও এমন বৃষ্টি ছিল।
সকাল থেকে থামার নাম নেই।
বিয়ের সব আয়োজন কমিউনিটি সেন্টারে।
দুপুরের দিকে খবর এল, ফুল, খাবার আর সাজসজ্জার জিনিস নিয়ে যে গাড়িটা আসছিল, সেটা মাঝরাস্তায় নষ্ট হয়ে গেছে।
বাড়িতে তখন একরকম অস্থির অবস্থা।
ফোন করা হচ্ছে।
কেউ ধরছে না।
বাবা বারবার বাইরে যাচ্ছেন।
মা শুধু বলছিলেন,
এখন কী হবে?
ঠিক তখন একটা রিকশা এসে থামল।
রিকশা থেকে একজন লোক নামলেন।
গায়ের শার্ট ভিজে একাকার।
হাতে একটা মোটা দড়ি।
তিনি বললেন,
গাড়িটা রাস্তার মাঝে বন্ধ হয়ে গেছে। যতটুকু পারি নামিয়ে রিকশায় করে নিয়ে আসছি।
কেউ তাকে চিনত না।
কে, কোথা থেকে এলেন, সেটাও কেউ জিজ্ঞেস করেনি।
তারপর প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মানুষটা এদিক-ওদিক ছুটলেন।
একবার ফুল।
একবার মিষ্টি।
একবার পানির বোতল।
শেষবার বরপক্ষের জন্য রাখা জিনিস।
সবকিছু পৌঁছে দিয়ে যখন হাঁপাচ্ছিলেন, তখন বাবা পকেট থেকে টাকা বের করলেন।
লোকটা মাথা নেড়ে বললেন,
না ভাই, লাগবে না।
কেন?
লোকটা একটু হেসে বললেন,
আমার মেয়ের বিয়ের দিনও কয়েকজন মানুষ এমন করে পাশে দাঁড়িয়েছিল।
আজ সুযোগ পেলাম, সেই ঋণটা একটু শোধ করলাম।
কথা শেষ করে তিনি চলে যাচ্ছিলেন।
নিশি দৌড়ে গিয়ে বলল,
চাচা, একটা ছবি তুলে যান।
লোকটা হেসে বললেন,
আমার ছবি দিয়ে কী হবে মা?
আমার ভালো লাগবে।
শেষ পর্যন্ত ফটোগ্রাফারকে ডেকে নিশিই বলেছিল,
উনাকেও রাখেন।
ছবিটা তোলা হলো।
তারপর মানুষটা কখন চলে গেলেন, কেউ খেয়াল করেনি।
অভিক অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
পরে আর দেখা হয়নি?
নিশি মাথা নাড়ল।
না।
অনেক খুঁজেছিলাম।
যেখানে গাড়িটা নষ্ট হয়েছিল, আশপাশের দোকানেও জিজ্ঞেস করেছিলাম।
কেউ চিনতে পারেনি।
কথা শেষ হয়ে গেল।
ঘরটাও চুপচাপ।
অভিক আবার ছবিটার দিকে তাকাল।
এত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
তবু বারবার চোখ যাচ্ছে ওই এক কোণায়।
ভেজা শার্ট পরা মানুষটার দিকে।
নিশি আলতো করে অ্যালবামটা বন্ধ করল।
বলল,
জানো, সেদিন সবাই আমাদের বিয়ের ছবি তুলেছিল।
শুধু আমরা একজন মানুষের নামটাই জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম।
অভিক কিছু বলল না।
অ্যালবামটা আবার আলমারিতে তুলে রাখল।
কিন্তু ছবিটা যেন সেখানেই রয়ে গেল না।
দুজনের মনেই আবার ফিরে এল সেই ভেজা শার্ট পরা মানুষটা।
যে এসেছিল। একটা কাজ করে দিয়েছিল।
তারপর চুপচাপ চলে গিয়েছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।