ফেরার দেশে, শেষ দেখাটুকু
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প ⋄ ১৯ নভেম্বর ২০২৫
রাত তিনটা বেজে কুড়ি।
দুবাইয়ের আল কুওজের শ্রমিক ক্যাম্পে লাইট নিভে গেছে আধঘণ্টা হল। অথচ ঘুম আসে না। অভিকের বিছানা একটা লোহার খাট, তার ওপর পাতলা ফোম, চাদরটা এমন ছেঁড়া যে বগল দিয়ে ফোম বেরিয়ে থাকে। পাশে রাকিব নাক ডাকছে। বাইরে এসি-র কম্প্রেসারের আওয়াজ আর দূরে হাইওয়ের গাড়ির গর্জন মিশে একটা অদ্ভুত লয় তৈরি করেছে।
অভিক মোবাইলটা হাতে নিল। হোয়াটসঅ্যাপে নিশির লাস্ট সিন ১২:৪৭ এএম। দেশে এখন সকাল সাড়ে আটটা। নিশি ক্লাসে গেছে নিশ্চয়। সে একটা সেলফি তুলল—চোখ লাল, মুখ শুকনো, দাড়ি দুদিনের। ছবিটা দেখে নিজেই মুছে দিল। তারপর লিখল,
“ভালো আছি। তুই কেমন?”
পাঠাল না।
তিন বছর ধরে একই খেলা।
দিনে বারো ঘণ্টা সাইটে রড বাঁধে, লোহার পাত বহন করে। সন্ধ্যায় হেলমেট খুলে ডেলিভারি ব্যাগ পরে। রাত এগারোটা-বারোটা পর্যন্ত রাস্তায়। কখনো ঘুম হয় চার ঘণ্টা, কখনো তিন। খায় রুটি আর ডাল দিয়ে মেশানো ডিমের ঝোল। মাঝে মাঝে দুপুরে সাইটের পাশে দাঁড়িয়ে এক কাপ চা আর দুটো পাউরুটি।
না খাওয়া টাকা জমিয়ে মাসে পঁচিশ-তিরিশ হাজার টাকা পাঠায় দেশে। নিশির সেমিস্টার ফি, মায়ের ডায়াবেটিসের ওষুধ, ছোট বোনের কোচিং।
নিজের জন্য কিছু রাখে না।
একবার একটা জুতো কিনতে গিয়েছিল। দোকানে দেখে ১৫০ দিরহাম। ভাবল, এই টাকায় দেশে দুই মাসের ওষুধ হয়ে যাবে। জুতো ফিরিয়ে এসেছে। পায়ে এখনো সেই ছেঁড়া সেফটি বুট, আঙুল বেরিয়ে আছে।
দেশে নিশি জানে না এসব।
জানলে কাঁদবে। আর অভিকের থেকে বড় শত্রু নিশির চোখের পানি আর কিছু নেই। তাই প্রতি রাতে ভিডিও কলে হাসে। চোখের নিচে কালি থাকলেও বলে, “আরে একটু রোদে পুড়েছি মাত্র।” হাতের কাটা দাগ দেখালে বলে, “ছোটখাটো, কালই শুকিয়ে যাবে।” নিশি বিশ্বাস করে। ভালোবাসা তো এমনই—যা দেখায় না, তাই বিশ্বাস করে।
গত মাসে নিশি বলেছিল,
“অভি, তুমি কবে আসছো? আমি আর পারছি না।”
অভিক চুপ করে ছিল অনেকক্ষণ। তারপর বলেছিল,
“আর একটু। তোমার পড়াশোনাটা শেষ হোক। তারপর আমি ফিরব। আমাদের একটা ছোট ঘর করব। তুমি চাকরি পাবে। আমি একটা দোকান দেব। আর কেউ কিছু বলতে পারবে না।”
নিশি হেসেছিল। কিন্তু অভিক জানে, ভিসার মেয়াদ আর মাত্র পাঁচ মাস। কোম্পানি নতুন করে রিনিউ করবে কি না, কে জানে। শুনেছে রোবট আসছে। যন্ত্র দিয়ে রড বাঁধবে। তখন তার মতো হাজার হাজার লোক রাস্তায়।
সেই ভয়টা রাতে গলা চেপে ধরে।
কখনো বাথরুমে গিয়ে মুখে পানি দেয়, কখনো বাইরে বেরিয়ে দাঁড়ায়। একদিন রাকিব দেখে ফেলেছিল। বলেছিল, “কাঁদছিস নাকি রে?”
অভিক হেসে বলেছিল, “ধুলো গেছে চোখে।”
রাকিব কিছু বলেনি। পরদিন সকালে তার বিছানার পাশে এক প্যাকেট টিস্যু রেখে গিয়েছিল। দুজনে আর কথা বাড়ায়নি।
গত সপ্তাহে দুর্ঘটনাটা হল।
রাত দুটো। বৃষ্টি ছিল। রাস্তা পিচ্ছিল। ডেলিভারি ব্যাগে তিন কেজি বিরিয়ানি। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল। পেছন থেকে একটা পিকআপ ট্রাক এসে ধাক্কা মারল। অভিক উড়ে গিয়ে পড়ল রাস্তার মাঝে। হেলমেটটা ছিটকে গেল। মাথায় গভীর কাটা, পা ভেঙে গুঁড়ো। রক্তে রাস্তা ভেসে গেল।
রাকিবই প্রথম পৌঁছেছিল। অভিক তখনো সজ্ঞানে। দুর্বল গলায় বলছিল,
“রাকিব… আমার ফোন… নিশিকে ফোন কর… বলিস আমি একটু দেরি করব… বলিস আমি ঠিক আছি…”
রাকিব কাঁদছিল। অভিক আবার বলল,
“আর বলিস… ও যেন কাঁদে না। আমার সবচেয়ে বড় ভয় ওর চোখে পানি।”
তারপর আর কিছু বলতে পারেনি।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে শেষ নিঃশ্বাস পড়ল।
দেশে খবর পৌঁছাল ভোরে।
নিশির বাবা ফোন ধরেছিলেন। প্রথমে বিশ্বাস করেননি। তারপর যখন বিশ্বাস করলেন, বাড়িতে কেউ কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। নিশি শুধু একটা কথাই বলছিল,
“আমি কাল রাতেই কথা বলেছি… ও তো বলল আজ ফোন করবে…”
বিমানবন্দরে কফিন এল তিন দিন পর।
কাঠের বাক্সটা দেখে নিশি আর দাঁড়াতে পারেনি। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল মেঝেতে। কেউ স্পর্শ করতে সাহস পায়নি। শুধু চিৎকার করছিল,
“অভি… উঠ… দেখ, আমি এসেছি… তুই তো বলেছিলি আমি গেলে তুই হাসবি…”
কবরস্থানে যখন মাটি নামানো হল, নিশি আর চেঁচাচ্ছিল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে একটা ছোট কাগজ—রাকিব পাঠিয়েছিল। অভিকের পকেটে পাওয়া গিয়েছিল। কাঁপা হাতের লেখা, কালি একটু মুছে গেছে ঘামে-রক্তে।
“নিশি,
তুই যদি এটা পড়িস তবে বুঝে নিস আমি আর পারিনি।
দুঃখ করিস না। আমি কখনো দুঃখে থাকিনি। তুই ছিলি বলে।
তোর পড়াশোনাটা শেষ করিস। বড় হ। নিজের পায়ে দাঁড়া।
আমার স্বপ্নটা তুই পূরণ করবি।
আর শোন, কাউকে বলিস—প্রবাস মানে শুধু টাকা না।
এখানে প্রতিদিন একটা যুদ্ধ হয়। কেউ দেখে না।
ভালো থাকিস। আমি তোর ভেতরে আছি।
—অভিক”
নিশি কাগজটা বুকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ।
তারপর মাটির ওপর বসে পড়ল। কান্না ছিল না আর। শুধু একটা শান্ত, গভীর কণ্ঠে বলল,
“তোর স্বপ্ন আমি মরতে দেব না। দেখিস।”
আজ ছয় মাস হয়ে গেল।
নিশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার জন্য আর দেড় বছর। সে এখনো অভিকের দেওয়া টাকায় পড়ে না। একটা টিউশনে পড়ায়, আর রাতে অনলাইনে লেখালেখি করে। মাসে যা আয় হয়, তার অর্ধেকটা অভিকের মায়ের অ্যাকাউন্টে পাঠায়। বলে,
“এটা অভিকের পাঠানো। আমি শুধু মাঝের লোক।”
কখনো ক্লান্ত হলে অভিকের ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বলে,
“দেখ, আমি হাসছি। তুই যেমন চেয়েছিলি।”
প্রবাসীদের কষ্ট কি সমাজ কোনোদিন বুঝবে?
হয়তো না।
কিন্তু নিশি বোঝে।
আর সে একদিন সবাইকে বোঝাবে—যে মানুষগুলো দূর দেশে নিজের জীবন বেচে অন্যের জীবন গড়ে, তাদেরও একটা হৃদয় থাকে, যেটা রক্তপাত করে প্রতিদিন।
অভিক ফিরেছে তার দেশে।
কিন্তু তার ভালোবাসা ফেরেনি।
সে এখনো প্রতিদিন নিশির পাশে হাঁটে—নিঃশব্দে, অদৃশ্য হয়ে।
পাঠকের উদ্দেশে শুধু একটা প্রশ্ন:-
“আপনার জীবনে যে মানুষটা আজও বিদেশের রাতে জেগে আপনার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে,
তাকে কবে শেষবার বলেছেন,
‘টাকা পরে পাঠাস, আগে তুই একটু নিজের খেয়াল রাখ’?”
কমেন্টে তার নামটা লিখে দিন।
আর ট্যাগ করে দিন তাকে।
যদি না থাকে, তাহলে লিখুন “অভিক”।
একটা কমেন্টই যথেষ্ট।
কারণ আজ রাতে হয়তো কোনো অভিক বসে আছে একা, আর অপেক্ষায় আছে শুধু এই একটা লাইকের জন্য।
#অভিক_ফিরে_আয় #প্রবাসীর_কষ্ট #বিদেশে_মানুষ_থাকে #টাকার_চেয়ে_তুই_দামি #প্রবাসী_নয়_মানুষ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।