নামহীন কবর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ১৪ জুন, ২০২৬
দুপুরের কবরস্থানটা কেমন জানি চুপচাপ। বাতাসও জোরে বয় না। মনে হয় কেউ ঘুমাচ্ছে, ডাক দিতে ইচ্ছা করে না। কবরগুলোর ফাঁক দিয়ে হাঁটলে একটা জিনিস চোখে লাগে—সবাই একরকম, কিন্তু কেউ কেউ একটু বেশিই হারায় যায়।
এক কোণায় নতুন মাটি। একটু উঁচু। ঠিক শুকায়ও নাই। নাম নাই, ফুল নাই, পাথরে লেখাও নাই। শুধু মাটি। আর কেমন জানি থমথমে ভাব।
কার কবর এটা—আগে মানুষ দুই-এক কথা বলত। এখন বলে না। মানুষ প্রশ্ন করতে পারে ঠিকই, কিন্তু সব প্রশ্ন বইতে পারে না।
আজাহার আলী। নামটা এটাই ছিল। গ্রামের পাশে টিনের ছোট একটা ঘর ছিল। উঠোনে একটা আমগাছ। গরমের দিনে ওই গাছটাই ছিল সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
বউ ছিল। দুইটা ছেলে। এককালে ওই ঘরে হাঁকডাক ছিল, খাওয়ার ডাক ছিল। এখন ওসব বললে মনে হয় অন্য কারও কথা বলছি।
সময়টা এমন—একবারে সব কেড়ে নেয় না। একটু একটু করে শেষ করে। এত আস্তে যে টেরই পাওয়া যায় না কখন ফুরায় গেল।
আগে বউটা মরল। তারপর বড় ছেলে শহরে গেল। ছোটটা অন্য জায়গায় কাজ নিল। প্রথমে ফোন দিত রোজ। পরে মাঝেমধ্যে। একসময় ফোন বাজত ঠিকই, কিন্তু ধরত না কেউ।
গ্রামের লোক বলত, “সবারই তো কাজ আছে।”
আজাহার আলী কিছু কইতেন না। সন্ধ্যায় উঠোনে বসে থাকতেন। আমগাছটা ছিলই। কিন্তু গাছ একই থাকলেও ছায়াটা যে বদলায়, এই কথাটা কাউরে বুঝায় নাই।
শেষের দিকে একাই ছিলেন। রান্না করতেন না বললেই চলে। বাজারে যাওয়াও কমে গেছিল। শরীরটাও আর আগের মতো চলত না।
এক প্রতিবেশী একদিন জিগাইল,
“চাচা, শহরে ছেলের কাছে যান না?”
তিনি একটু হাসলেন।
“কার কাছে যামু?”
কথা আর আগায় নাই।
এক সকালে ঘরে পাওয়া গেল না। দরজা খোলা। বিছানা এলোমেলো। উঠোনে আমগাছটা দাঁড়ায় ছিল আগের মতোই।
মানুষ আসল। বুঝল, কাহিনি শেষ।
এরপর শুরু হলো ঝামেলার অংশ—যেটা কেউ গল্পে বলে না, কিন্তু করতেই হয়।
কাগজপত্র। নাম। ঠিকানা। আইডি। মরাটাও একটা সিস্টেমে ফেলতে হয়, নাইলে সরকার বোঝে না।
তার কাছে সেরকম কিছু ছিল না। একটা পুরান ভোটার আইডি, অর্ধেক লেখা মুইছা গেছে। আর মানুষের আন্দাজ। কেউ জোর দিয়া কিছু বলতে পারল না।
যা হইল আরকি। দাফন হইল। মাটি দিল। দোয়া পড়ল।
কবর হইল কবরস্থানের এক পাশে। লোকজন দাঁড়াইছিল, বেশি সময় না। জীবনের মতো মৃত্যুটাও একসময় হালকা হয়ে যায়।
প্রথম কয়দিন মানুষ জিগাইত,
“এটা কার কবর?”
উত্তর আসত,
“এক বুড়া মানুষ আছিল।”
তারপর জিগানোটাও থেমে গেল।
সময় তার কাজ শুরু করল।
বৃষ্টি আসল, গেল। রোদ পড়ল। ঘাস উঠল। মাটি আগের মতো নাই, কিন্তু বোঝাও যায় না। নাম নাই জায়গাটা আস্তে আস্তে বাকি কবরের মতোই হয়ে গেল।
তফাৎ একটাই—এইটার পাশে কেউ দাঁড়ায় না।
কেউ কেউ জিগায় আবার, কিন্তু মাঝপথে চুপ করে যায়। যেন উত্তরটা দরকার নাই আর।
নাম না থাকলে গল্পও বাঁচে না বেশিদিন।
কয়েক বছর পর ছোট ছেলেটা গ্রামে ফিরল।
এখন শহরে থাকে। কাজ করে। জীবন চলছে বলা যায়। আবার কিছু জায়গায় আটকায়ও আছে—এটা কাউরে বলে না।
এসে কবরস্থান খুঁজল।
কিন্তু মুশকিল—কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না কোনটা বাপের কবর।
এক বুড়া আঙুল দিয়ে দূরে দেখায় দিল,
“মনে হয় ওইদিকে…”
“মনে হয়”—এই দুইটা শব্দে অনেক কিছু ঢাকা পড়ে যায়।
ছেলেটা গিয়ে দাঁড়াল।
কিছু বলল না।
চারপাশে বাতাস। পাতার শব্দ। দূরে কারও গলা শোনা যায়, তারপর মিলায় যায়। পৃথিবী থেমে নাই—এই সোজা কথাটাই এমন সময়ে বুকের মধ্যে বিঁধে।
মাটির দিকে তাকায় থাকল।
নাম নাই। তারিখ নাই। শুধু একটা জায়গা। একদিন এখানেই কারও শেষ হইছিল।
মনে হইল, দেরি করে নাই সে। শুধু সময়টা এমনভাবে গেছে যে আর মিলানো যায় নাই।
বসল না। দাঁড়ায় থাকল।
মাটিতে হাত দিল না। কিছু রাখল না। কিছু বললও না।
কারণ দেরি হয়ে গেলে মানুষ বোঝে না কী করতে হয়। মাঝে মাঝে কিছু না করাটাই সবচেয়ে সত্যি কাজ।
একটু পর উঠে দাঁড়াল।
শেষবার কবরটার দিকে তাকাইল।
মনে হইল, সব পরিচয় মুইছা যায়। পড়ে থাকে শুধু জায়গাটা।
পিছন ফিরে হাঁটা ধরল।
আরেকবার তাকাইল পিছনে।
কবরটা আগের মতোই। চুপচাপ। নাম নাই। কারও জন্য বসে নাই।
আর তখনই মাথায় আসে—একটা মানুষের আসল পরিচয় কি নামে?
নাকি সে কয়জনের মনে কতদিন থাকে, ওইটাতে?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।