মৃত্যুর দরজায় কড়া নাড়া
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
স্মৃতিকথা। ০৫ মার্চ ২০২৬
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২। দিনটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। সকালের কফি, তাড়াহুড়ো করে অফিসে বের হওয়া, ফাইলের স্তূপ, মিটিংয়ের চাপ—সবই স্বাভাবিক। জীবন তখন নিয়মের ভেতর চলছিল।
দুপুর ১২টার কিছু পর বুকের বাম পাশে চাপ অনুভব করলাম। তীক্ষ্ণ ব্যথা নয়—এক ধরনের ভার, যেন বুকের ভেতর কিছু জমে আছে। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম গ্যাস। দুপুরে ঠিকমতো খাওয়া হয়নি।
লাঞ্চে ভাত, সবজি আর মাছ খেলাম। খাওয়ার পর মনে হলো শরীর কিছুটা হালকা হবে। হলো না। বরং বুকের ভেতরের চাপটা আরও ঘন হয়ে উঠল। শ্বাস নিতে অস্বস্তি। বুক ভরে বাতাস নিতে পারছি না।
ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেলাম। কাজ হলো না।
বিকেলের দিকে শরীর অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। বাইরে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিলাম—অফিসে দায়িত্ব আছে, মানুষ আছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন অদৃশ্য কোনো চাকা ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় গুলশান থেকে গাড়িতে উঠলাম। যানজট, ধুলা, হর্ন—সবই আগের মতো। শুধু আমার বুকের ভেতরটা আগের মতো নেই। বাসায় পৌঁছাতে প্রায় সাতটা বাজে।
গোসল করলাম। ঠান্ডা ঘরে শুয়ে রইলাম। কিছুতেই অস্বস্তি কমছে না। শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। বুকের ভার এখন চাপের মতো।
ছোট ভাইকে খবর দেওয়া হলো। সে দ্রুত এলো। তার ধারণাও—গ্যাস। আমি খাটে বসে ছিলাম। ও ডাকতেই পা নামাতে গেলাম। বুঝলাম পা দুটো অবশ। যেন আমার শরীর আমার কথা শুনছে না। ঘাড় শক্ত হয়ে আসছে। ঠোঁট কাঁপছে।
ভয় তখন আর অনুমান নয়—বাস্তব।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। সিদ্ধান্ত হলো হাসপাতালে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
সাত মিনিটের মধ্যে নিকটবর্তী একটি হাসপাতালে পৌঁছালাম। জরুরি বিভাগে নেওয়া হলো। রক্তচাপ মাপতেই ডাক্তারের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। দ্রুত ইসিজি করা হলো। মনিটরের কাগজে আঁকাবাঁকা রেখা উঠছে।
ডাক্তার সংক্ষিপ্তভাবে বললেন,
“হার্টবিট দুর্বল। সময় নষ্ট করা যাবে না। দ্রুত কার্ডিয়াক সেন্টারে নিতে হবে।”
প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলো। অক্সিজেন লাগানো হলো। স্থানান্তরের প্রস্তুতি, কাগজপত্র, অ্যাম্বুলেন্স—এই ব্যবস্থাপনার মাঝেই কয়েক মিনিট কেটে গেল। তখন সময়ের হিসাব আর স্বাভাবিক ছিল না। প্রতিটি মিনিট আলাদা করে ভারী লাগছিল।
রাত ১২টা ০৩। আমাকে ভর্তি করা হলো -এ।
অ্যাম্বুলেন্স ছুটছিল। রাজারবাগ পেরিয়ে শাহবাগের দিকে। মৎস্য ভবনের সামনে এসে বুকের ভেতর হঠাৎ যেন কিছু ছিঁড়ে গেল। চোখের সামনে আলো দুলতে লাগল। শব্দগুলো দূরে সরে গেল। শরীর হালকা হয়ে আসছে, অথচ ভেতরে অজানা ভার।
তারপর সব নিভে গেল।
এরপরের অংশ আমার স্ত্রীর মুখে শোনা।
হাসপাতালে নেওয়ার সময় আমার কোনো হার্টবিট ধরা যাচ্ছিল না। একাধিক ডাক্তার একসঙ্গে চেষ্টা করছেন। কার্ডিয়াক টিম দ্রুত কাজ শুরু করে। ছয়বার বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। মাঝেমধ্যে সামান্য সাড়া, আবার নিস্তব্ধতা।
অবস্থা ছিল মেজর মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন—প্রধান ধমনীতে জটিল ব্লক।
হঠাৎ মনিটরে সামান্য সাড়া। তারপর আরও কিছু শব্দ। ডাক্তারদের কণ্ঠে বদল।
“পালস এসেছে।”
মাথার কাছে আমার স্ত্রী। সে সারারাত কিছু খায়নি। তার চোখের জল কপালে পড়ছিল। হাত রেখে ছিল স্থিরভাবে—যেন হাত সরালে আমি আবার হারিয়ে যাব।
ভোরের দিকে জ্ঞান ফিরল। চারপাশে সাদা আলো। হাতে ক্যানোলা। স্যালাইন ঝরছে। ডাক্তার এসে বললেন—সময় কম। জরুরি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করতে হবে।
ট্রলিতে শুয়ে অপারেশন থিয়েটারের দিকে যাচ্ছি। বাইরে সহকর্মীরা দাঁড়িয়ে। কেউ কিছু বলছে না। চোখে জল। আমি তাকিয়ে ছিলাম। শব্দ বের হয়নি।
ওটি রুমে প্রবেশ করলাম। বড় আলো মাথার ওপরে। নিখুঁত সাজানো যন্ত্রপাতি। পায়ের কুঁচকির কাছে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হলো। উষ্ণতা অনুভব করলাম। তারপর সরু তারের মতো কিছু শরীরের ভেতর এগোচ্ছে—রক্তনালী দিয়ে।
একটি স্টেন্ট বসানো হয়। রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা হয়।
চোখ খুললাম সিসিইউতে। অক্সিজেন মাস্ক। মনিটরের ছন্দময় শব্দ। প্রতিটি স্পন্দন স্ক্রিনে উঠছে। জীবন তখন সংখ্যায় মাপা।
একসময় মনিটরের শব্দ ধীর হয়ে এল। শরীর আবার দূরে সরে যাচ্ছিল।
কতক্ষণ কেটেছে জানি না।
কপালে ঠান্ডা স্পর্শে চোখ খুললাম।
আমার ১১ বছরের মেয়ে।
সে কিছু বলেনি।
ঠোঁট কামড়ে ধরে ছিল।
ছোট আঙুলটা কপালে চেপে রেখেছিল—স্থির।
চোখে জল ছিল, কিন্তু শব্দ ছিল না।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
সেই নীরবতার ভেতরেই একটা টান ছিল—অদৃশ্য, দৃঢ়।
সেদিন প্রথমবার অনুভব করলাম—আমাকে থাকতে হবে।
দায়িত্বের জন্য নয়। চাকরির জন্য নয়। সমাজের জন্য নয়। এই ছোট হাতটার জন্য।
ভেতরে কোথাও যেন শক্ত কিছু ফিরে এলো। শ্বাসটা গভীর হলো। মনিটরের শব্দ আবার ছন্দ পেল।
সেদিন আমি শুধু মৃত্যুর মুখোমুখি হইনি। আমি বুঝেছি জীবন কত সহজে থেমে যেতে পারে—আর কত নিঃশব্দে ফিরে আসতে পারে।
আজও মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থাকি। বুকের ভেতরের স্পন্দন টের পাই। অন্ধকার ঘরে কোনো মনিটর নেই, কোনো ডাক্তার নেই—তবু সেই রাতের শব্দ যেন কোথাও রয়ে গেছে।
প্রতিটি হৃদস্পন্দন এখন আমার কাছে হিসাবের বিষয় নয়—অনুমতির মতো।
বেঁচে থাকা অভ্যাস নয়।
প্রতিদিনের নতুন সুযোগ।
#মৃত্যুরদরজায় #দ্বিতীয়জীবন #হৃদস্পন্দন
#মেয়েরস্পর্শ #বেঁচেথাকা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।