গ্রামের মেলায় একদিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প।জানুয়ারি ২৩,২০২৬
জীবনের এই সময়ে এসে বুঝেছি, কিছু দিন আর জায়গা সময়ের সঙ্গে হারায় না। তারা স্মৃতির ভেতরে জমে থাকে—ধুলো, গন্ধ, শব্দ আর অসম্পূর্ণ কথার মতো। গ্রামের মেলাও তেমনই এক জিনিস। বছরে একদিন বসত, কিন্তু তার রেশ থাকত সারা বছর। এখন শহরের ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন শীতের বিকেল দেখি, তখন হঠাৎ করে মনে পড়ে যায়—গ্রামের মেলায় একদিন।
সেই দিনটা শুরু হতো ভোর থেকেই। এখনকার মতো অ্যালার্মে ঘুম ভাঙত না। ঢোলের আওয়াজে ঘুম ভাঙত। কুয়াশার ভেতর দিয়ে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ, যেন কেউ বলছে—আজ আলাদা দিন। বয়স তখন কম ছিল, কিন্তু মনে আছে—মায়ের গলায় বাড়তি তাড়া, বাবার মুখে চাপা উত্তেজনা। রান্নাঘর থেকে পিঠে ভাজার গন্ধ আসত। সেই গন্ধে মনে হতো, আজ কিছু একটা ঘটবে।
এখন বুঝি, তখনকার মেলাটা শুধু আনন্দের জায়গা ছিল না। ওটা ছিল গ্রামের একমাত্র দিন, যেদিন সবাই একটু বেশি মানুষ হতো। সকালে মাঠে গিয়ে দেখতাম বাঁশের খুঁটি পোঁতা হচ্ছে, রঙিন কাপড় ঝুলছে। প্যান্ডেল উঠছে। যারা সারাবছর আলাদা আলাদা কাজে ব্যস্ত থাকত, তারা সেদিন একসঙ্গে কাজ করত। কারো হাতে দড়ি, কারো হাতে হাতুড়ি। তখন এসব দেখে ভালো লাগত, এখন মনে হয়—এটাই ছিল আমাদের সামাজিক বন্ধনের শেষ চিহ্ন।
দুপুরের দিকে মেলায় ঢোকা মানেই এক ধরনের বিস্ময়। বয়স যতই হোক, চোখ তো চোখই। বেলুন, খেলনা, বাঁশি, চুড়ি—সবকিছু একসঙ্গে দেখা যেত। তখন মনে হতো, দুনিয়ার সব রঙ বুঝি এই মাঠেই জড়ো হয়েছে। এখন শহরের শপিং মলে হাঁটলেও সেই অনুভূতিটা আসে না। কারণ সেখানে রঙ আছে, কিন্তু মানুষ নেই।
মেলায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক মুখ চোখে পড়ত। কেউ বহুদিন পর দেখা, কেউ প্রায় হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়। জীবনের এই সময়ে এসে বুঝেছি—মেলা আসলে পুনর্মিলনের জায়গা। সেখানে কথা কম, চোখের ভাষা বেশি। কারো দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নাড়ালেই বোঝা যেত—হ্যাঁ, এখনো আছি।
নাগরদোলার সামনে দাঁড়িয়ে আজও মনে পড়ে—ভয় আর আনন্দ কীভাবে একসঙ্গে থাকে। এখন জীবনের নাগরদোলায় চড়ি প্রতিদিন, কিন্তু তখনকার সেই দোলাটাই ছিল সবচেয়ে সৎ। উঠলে ভয়, নামলে হাসি। এখন উল্টো—উঠি দায়িত্বে, নামি ক্লান্তিতে।
সন্ধ্যার পর মেলার রং বদলে যেত। হারিকেনের আলো, যাত্রাপালার ঘোষণা, সার্কাসের ডাকে ভিড়। তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ জানি—ওই যাত্রাগুলো শুধু বিনোদন ছিল না। ওগুলো ছিল আমাদের সমাজের আয়না। অন্যায়, ভালোবাসা, লড়াই—সবকিছু খোলা মাঠে মঞ্চস্থ হতো। মানুষ হাততালি দিত, কখনো চোখ মুছত। আজ টিভি আর মোবাইলেও গল্প দেখি, কিন্তু শরীর দিয়ে অনুভব করি না।
খাবারের দোকানগুলো তখন আলাদা আনন্দ। জিলিপির গন্ধ, চায়ের ধোঁয়া। বাবার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা, “কি খাবি?” প্রশ্নটার অপেক্ষা। এখন নিজের সন্তানকে সেই প্রশ্ন করি, কিন্তু জানি—তার কাছে এটা আর উৎসব নয়। সময় বদলে গেছে।
রাত বাড়লে মেলা ধীরে ধীরে নিভে যেত। দোকান গুটোত, ভিড় কমত। মাঠে পড়ে থাকত কাগজ, ভাঙা খেলনা, নিভে যাওয়া আলো। তখনই প্রথম বুঝতাম—সব ভালো জিনিস শেষ হয়। আজ জীবনেও সেটাই সবচেয়ে বেশি দেখি।
মেলা শেষ হলে গ্রাম আবার আগের মতো হয়ে যেত। কিন্তু মানুষগুলোর মধ্যে একটা আলাদা নীরবতা নেমে আসত। যেন সবাই জানত—আর এক বছর অপেক্ষা। এখন বুঝি, ওই অপেক্ষার ভেতরেই ছিল জীবনের ছন্দ।
আজ শহরে থাকি। গ্রাম অনেক দূরে। মেলাও হয়তো আর আগের মতো হয় না। অনেক মানুষ নেই, অনেক গল্প থেমে গেছে। কিন্তু গ্রামের মেলায় একদিন এখনো বেঁচে আছে আমার ভেতরে। কারণ সেটা শুধু উৎসব ছিল না—ওটা ছিল জীবনের একটা অধ্যায়, যেখানে মানুষ কম, অনুভূতি বেশি ছিল।
জীবনের এই সময়ে এসে এইটুকুই বুঝেছি—কিছু দিন ক্যালেন্ডারে থাকে না। তারা মানুষ হয়ে আমাদের ভেতরে বাস করে। গ্রামের মেলায় একদিনও তেমনই এক মানুষ।
#গ্রামেরমেলায়একদিন #জীবনেরএইসময়
#মধ্যবয়সেরবোধ #গ্রামবাংলা #লোকজস্মৃতি
#বাংলাছোটগল্প #নস্টালজিয়া
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।