অভ্যাসের সংসার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আমি আমার বউকে ভালোবাসি না, কিন্তু তাকে ছাড়া বাঁচতেও পারব না।
কথাটা প্রথম বুঝেছিলাম এক রাতে, যখন সে পাশের ঘরে বসে কাঁদছিল আর আমি টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম। বারো বছরের সংসারে এমন রাত নতুন কিছু ছিল না। আগে ও কাঁদলে আমার অস্বস্তি হতো। কাছে গিয়ে জানতে চাইতাম, কী হয়েছে। এখন আর জানতে ইচ্ছে করে না। ও কাঁদে, আমি খেলা দেখি। কিছুক্ষণ পর ও ঘুমিয়ে পড়ে, আমিও বিছানায় যাই।
পরদিন সকালে দুজনেই চা খাই।
বারো বছর আগে ওকে বিয়ে করেছিলাম নিজের পছন্দে। তখন ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য অজুহাত খুঁজতাম। অফিস থেকে ফেরার পথে ওর পছন্দের খাবার কিনে আনতাম। ছুটির দিনে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করতাম। ও হাসলে মনে হতো, দিনটা ভালো গেল।
এখন ও হাসলে বুঝতে পারি না, কেন হাসছে। আমার কোনো কথায় ও কষ্ট পেলে সেটা বোঝার চেষ্টাও করি না।
আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়, তবে আগের মতো চিৎকার করে নয়। এখন আমরা হিসাব করে কথা বলি। কোন কথায় অন্যজন রেগে যাবে, কোন প্রসঙ্গে পুরোনো অভিযোগ ফিরে আসবে—সবই জানা। তাই অনেক কথা বলি না।
একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি, ও আলমারির ওপর কয়েকটা কাপড় গুছিয়ে রেখেছে।
“কোথাও যাবে?”
“মায়ের বাসায়।”
“কত দিনের জন্য?”
“জানি না।”
আমি জুতা খুলতে খুলতে বললাম, “আচ্ছা।”
ও কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাপড়গুলো ব্যাগে ভরে নিল।
রাতে খেতে বসে দেখি, টেবিলে একটা চেয়ার ফাঁকা। ভাতের হাঁড়ি থেকে নিজের মতো করে ভাত নিলাম। তরকারির বাটিটা হাতের কাছে ছিল না। উঠে গিয়ে আনতে হলো। খাওয়ার পর রান্নাঘরে প্লেট রেখে এলাম।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল দেরিতে। চা বানিয়ে অফিসে যাওয়ার আগে ওর ফোন এল।
“ফ্রিজে তরকারি আছে। গরম করে খেয়ে নিও।”
“হুম।”
“ওষুধগুলো সময়মতো খেয়ো।”
“আচ্ছা।”
ফোন রেখে আমি কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইলাম।
সন্ধ্যায় এক বন্ধুকে ফোন করেছিলাম। অনেকক্ষণ গল্প করার পর সে জিজ্ঞেস করল, “ভাবি কই?”
বললাম, “মায়ের বাসায়।”
“তুই একা আছিস?”
“হ্যাঁ।”
সে হেসে বলল, “বারো বছর পর একটু ছুটি পেলি। ঘুরে বেড়া।”
আমি হাসলাম। কিন্তু ফোন রাখার পর কোথাও যাওয়ার কথা মনে হলো না। বন্ধুদের সঙ্গে বসার কথা ভাবলাম, তারপর বাতিল করলাম। রাতে সিনেমা চালিয়েও মাঝপথে বন্ধ করে দিলাম।
বিছানার একপাশ খালি ছিল।
তিন দিন পর ও ফিরে এল। দরজা খুলে আমাকে দেখে বলল, “খেয়েছ?”
“না।”
“আমি হাত-মুখ ধুয়ে নিচ্ছি। তারপর দিচ্ছি।”
ও রান্নাঘরে চলে গেল। আমি সোফায় বসে রইলাম।
রাতে খেতে বসে ও আমার প্লেটে ভাত তুলে দিল। আমি ওর জন্য পানির গ্লাস এগিয়ে দিলাম। কোনো ভালোবাসার কথা হলো না, কোনো অভিমানও প্রকাশ পেল না।
খাওয়া শেষে ও থালা তুলতে গেল। আমি বললাম, “থাক, আমি রাখছি।”
ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। তারপর থালাটা টেবিলে রেখে চলে গেল।
সেদিন রাতে পাশাপাশি শুয়ে ছিলাম আমরা। মাঝখানে সামান্য দূরত্ব। ওর শ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। বারো বছর আগে এই মানুষটার কাছে থাকার জন্য কত অজুহাত খুঁজতাম। এখন পাশে থেকেও কত দূরে।
অন্ধকারে ও হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “ঘুমিয়েছ?”
“না।”
“কাল সকালে বাজার থেকে ডিম নিয়ে এসো। বাসায় শেষ হয়ে গেছে।”
“আচ্ছা।”
ও পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।
আমি ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার বাজার করতে হবে, চা বানাতে হবে, অফিসে যেতে হবে।
পাশে শুয়ে থাকা মানুষটাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। বারো বছরের অভ্যাসে আমরা দুজনেই জানতাম, সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার একসঙ্গে চা খাব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।