অসমাপ্ত প্রেম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। মার্চ ২২, ২০২৬
রাস্তার বাঁকের চায়ের দোকানটা এখনো আছে। শুধু আমরা নেই। সেদিন বিকেলটা একেবারে সাধারণ। আকাশে মেঘ নেই, বাতাসও শান্ত। তবে সেই স্বাভাবিকতার মধ্যে যেন একটি অদৃশ্য চাপ লুকিয়ে আছে—শুধু অনুভূত হয়। তুমি আগে এসে বসেছিলে। চায়ের কাপ হাতে, চোখে কিছু মৃদু ভাবনা। আমি ধীরে ধীরে পৌঁছালাম, তোমার দিকে তাকিয়ে। মনে হলো, মন যেন অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে। “দেড়ি হলো?” তুমি জিজ্ঞেস করলে, হাতে কাপ ধরে। চোখে অল্প-অস্থিরতা। “ট্রাফিক,” আমি হালকা হেসে বললাম। কিন্তু চোখে এক অর্ধসত্য লুকিয়ে ছিল—আমরা দুজনেই বুঝতে পেরেছি। চায়ের কাপ এলো, ধোঁয়া উড়ছে। আমরা চায়ের দিকে তাকিয়ে আছি, এক অদ্ভুত নীরবতায়। না বলা কথাগুলো যেন সেখানে জমে আছে। অনেক কিছু বলার ছিল, কিন্তু বলা হয়নি। “সবকিছু কি সবসময় একই থাকে?” হঠাৎ তুমি বললে। আমি কিছুক্ষণ চুপ করলাম, তারপর চোখে তাকিয়ে বললাম, “না, থাকে না।” তারপর আবার নীরবতা। এই চুপটি নতুন নয়, তবে সেই দিন যেন অন্য রকম ভারী হয়ে উঠেছে। প্রতিটা না বলা কথার ওজন সেখানে জমে আছে। চাইছিলাম জিজ্ঞেস করতে—“তুমি কি আর থাকতে চাও না?” কিন্তু বাক্যটি গলায় আটকে গেল। তুমি শুধু চুপ করে বসেছিলে। তুমি বলতে চেয়েছিলে—“থাকতে চাই… কিন্তু পারছি না।” কিন্তু মুখে কিছুই বলেননি। আমরা দুজনেই বুঝেছিলাম, গল্পটা শেষের দিকে। কেউ “শেষ” শব্দটা বলেনি। “ভবিষ্যৎটা কেমন হবে, জানি না,” তুমি বললে, হালকা হাসি দিয়ে, চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। আমি চুপচাপ তাকালাম, তারপর বললাম, “আমরা ঠিকই সামলাব।” কিন্তু চোখে চোখ রেখে বুঝলাম—এটা শুধু ফাঁকা কথার শান্তি, নিজেদের আত্মশান্তির জন্য। চায়ের কাপ খালি হয়ে গেল। কথাগুলোও। তুমি ব্যাগটা তুললে। আমি বিল দিতে গেলাম। সবকিছু এত স্বাভাবিকভাবে ঘটছিল—যেন এক সাধারণ দিন, কোনো বিশেষ মুহূর্ত নয়। দোকান থেকে বের হওয়ার সময় তুমি একবার তাকালে। চোখে কিছু একটা—ভাঙা, অস্থির। আজও বুঝতে পারি না, তুমি কি দেখছিলে, নাকি শুধু সময়ের ভার অনুভব করছিলে। “ভালো থেকো।” তুমি বললে। আমি হেসে বললাম, “তুমিও।” আমরা কেউই “বিদায়” বলিনি। তুমি হেঁটে চলে গেলে, আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর মনে হলো—চাইলে ডাকতে পারতাম। একবার বললেই—“থাকো।” হয়তো তুমি থামতে। হয়তো না। আমি ডাকিনি। সেদিনের পর আমরা আর দেখা করিনি। কোনো ঝগড়া হয়নি। কেউ কাউকে দোষ দেয়নি। কোনো নাটকও হয়নি। শুধু—থেমে গেছে। মাঝে মাঝে এখনো ওই রাস্তা দিয়ে যাই। চায়ের দোকানের পাশে চোখ রাখি। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ কথা বলছে। সবকিছু আগের মতোই আছে। শুধু আমরা নেই। কখনো ভাবি—সেদিন যদি আমি খোলামেলা হতাম, তুমি যদি একটু সাহসী হতেই, এক কথাও বলা হতো—যেটা আমরা দুজনেই বুকে গুঁজে রেখেছিলাম। হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো। আবার মনে হয়—হয়তো না। মনে পড়ে, তুমি হাতে কাপ ধরে বসে থাকলে হঠাৎ চোখে ভাঙা ভাব আসে। আমি চুপচাপ তাকাই। জানি না কি দেখার চেষ্টা করছিলাম—সম্ভবত সময়ের ভার। ছোট বিস্ময়, হঠাৎ হাসি, চোখের নীরবতা—সব মিলিয়ে অনুভূতি আরও গভীর হয়ে ওঠে। কিছু গল্পের আসলে শেষ লেখা থাকে না। ওগুলো শেষ হওয়ার জন্য নয়। ওগুলো থেমে যাওয়ার জন্য তৈরি। তুমি এখন কোথায় আছো, জানি না। ভালো আছো কি না—সেটাও জানি না। শুধু এটুকু জানি—আমাদের গল্পটা শেষ হয়নি। এটা এখনো কোথাও আছে। একটা বিকেলের ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে, একটা না বলা কথার মধ্যে, আর বিদায়ের অদৃশ্য ছায়ায়। চুপচাপ বসে থাকা কারো চোখে, তোমার অদৃশ্য উপস্থিতি মনে পড়ে। এমন গল্প আছে—যেটা শেষ হয় না, শুধু থেমে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।