বাবাকে বলা হয়নি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
আদনান প্রতিদিন বাবাকে একটা মিথ্যা বলত।
"সব ঠিক আছে বাবা।"
কিন্তু আসলে কিছুই ঠিক ছিল না। তবু সে বলত। কারণ সে চাইত না, বাবা আবার নতুন করে চিন্তা করুক।
ছোটবেলা থেকেই আদনান জানত, তাদের সংসারে টাকা খুব হিসাব করে খরচ করতে হয়।
বাবা কামাল সাহেব একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। মাসের প্রথম সপ্তাহে ঘরে একটু স্বস্তি থাকত। তারপর ধীরে ধীরে হিসাবের খাতা বের হতো।
বাজারের খরচ। বাড়িভাড়া। বোনের স্কুলের টাকা। সব দেওয়ার পর বাবার নিজের জন্য খুব বেশি কিছু থাকত না। তবু তিনি কখনো মুখে সেটা আনতেন না।
আদনান ছোটবেলায় কোনো কিছু চাইলে বাবা প্রায়ই বলতেন, "এখন না হয় থাক বাবা। পরে কিনে দেব।"
সেই "পরে" অনেক সময় আর আসত না। কিন্তু আদনান তখন বুঝত না।
আদনানের একটা স্বপ্ন ছিল। সে ছবি আঁকতে ভালোবাসত। স্কুলের খাতার শেষ পাতাগুলো সবসময় আঁকাআঁকিতে ভরা থাকত।
তার শিক্ষক একদিন বলেছিলেন, "তোর হাত ভালো। এটা ধরে রাখিস।"
আদনানও ভেবেছিল, একদিন ছবি নিয়েই কিছু করবে।
কিন্তু বাবার চাকরিটা চলে যাওয়ার পর অনেক কিছু বদলে গেল। ঘরের কথাবার্তায় তখন শুধু প্রয়োজনের হিসাব। কোথায় কমানো যায়। কোথায় একটু অপেক্ষা করা যায়।
আদনান নিজের আঁকার খাতাগুলো আলমারির এক পাশে তুলে রাখল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সে বাবাকে বলেছিল, "চিন্তা করো না বাবা। নিজের খরচ আমি চালিয়ে নেব।"
বাবা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবটা এত সহজ ছিল না।
ক্লাসের পর টিউশনি করেও সব সামলানো যাচ্ছিল না।
একদিন বন্ধু রাকিব বলল, "একটা কাজ আছে। সময় মিলিয়ে করতে পারবি।"
ছোট একটা কম্পিউটার দোকান, ফার্মগেটের দিকে। হিসাব রাখা আর অনলাইনের কিছু কাজ। বেতন বেশি না। কিন্তু মাস শেষে একটা নির্দিষ্ট টাকা পাওয়া যাবে।
আদনান রাজি হয়ে গেল।
সেই দিন থেকেই বাবার কাছে তার আরেকটা জীবন তৈরি হলো।
সকালে বিশ্ববিদ্যালয়। বিকেলে কাজ। রাতে পড়াশোনা।
শরীর ক্লান্ত হয়ে যেত। কিন্তু রাতে বাবা যখন জিজ্ঞেস করতেন, "পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে তো?"
সে হাসি দিয়ে বলত, "হ্যাঁ বাবা, সব ঠিক আছে।"
এই কথাটাই ছিল তার সবচেয়ে বেশি বলা মিথ্যা।
একদিন বাবা বললেন, "তুই শুধু পড়াশোনাটা শেষ কর। তারপর দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
আদনান কিছু বলল না। কারণ সে জানত, বাবা এখনো ভাবছেন ছেলে শুধু পড়াশোনা করছে।
তিনি জানেন না, ছেলে নিজের স্বপ্নের সঙ্গে একটু একটু করে সমঝোতা করছে।
এক সন্ধ্যায় কামাল সাহেব আদনানের ব্যাগে একটা কার্ড পেলেন। একটা ছোট দোকানের আইডি কার্ড।
তিনি কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
আদনান বাড়ি ফিরলে বাবা শুধু জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কার?"
আদনান থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল, "আমার।"
"কোথায় কাজ করিস?"
আদনান নিচু গলায় বলল, "ছয় মাস হলো।"
বাবা রাগ করলেন না। এটাই আদনানের জন্য আরও কঠিন ছিল।
তিনি শুধু বললেন, "আমাকে বলিসনি কেন?"
আদনান অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, "তুমি চিন্তা করতে।"
কামাল সাহেব জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, "তুই ভাবলি, তোর কষ্টের কথা শুনলে আমি ভেঙে পড়ব?"
আদনানের চোখ নিচু হয়ে গেল।
সেদিন রাতে দুজনের কারও ঘুম আসেনি।
একজন ভাবছিল, ছেলে এত কিছু একা একা করল কেন। আরেকজন ভাবছিল, বাবাকে কষ্ট দিল কি না।
পরদিন সকালে কামাল সাহেব একটা পুরোনো খাতা এনে ছেলের হাতে দিলেন।
"চিনতে পারিস?"
আদনান খাতাটা খুলে থেমে গেল। ভেতরে তার ছোটবেলার আঁকা ছবি। কিছু আধা শেষ ছবি। কিছু রঙ পেন্সিলের দাগ।
বাবা সব রেখে দিয়েছিলেন।
আদনান অবাক হয়ে বলল, "এগুলো এখনো রেখেছ?"
কামাল সাহেব হেসে বললেন, "তোর অনেক জিনিসই তো রাখতে পারিনি। এটা অন্তত রেখেছি।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন, "সংসারের জন্য দায়িত্ব নিতে হয়। সেটা ঠিক। কিন্তু নিজের পছন্দের জিনিসটা একেবারে মেরে ফেলিস না।"
এরপরও আদনানের জীবন সহজ হয়নি। কাজ ছিল। পড়াশোনা ছিল। দায়িত্ব ছিল।
তবু রাতে কিছুটা সময় বের করে সে আবার আঁকা শুরু করল। এবার লুকিয়ে না। বাবা জানতেন।
কয়েক বছর পর একটা প্রদর্শনীতে আদনানের একটা ছবি জায়গা পেল।
সেদিন প্রথম যে মানুষটা ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি কামাল সাহেব।
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "ছোটবেলায় তোর খাতাতেও এমনই আঁকতিস।"
আদনান হেসে বলল, "তখন তো কেউ কিনত না।"
বাবাও হাসলেন। "এখন কিনবে।"
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।