মেয়েটার নতুন জামা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৭ জুন, ২০২৬
ঈদের সকাল। ঘুম থেকে উঠেই মায়া বাবার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখে তখনও ঘুমের রেশ, চুল এলোমেলো।
“বাবা, আমার নতুন জামাটা কই?”
অভিক এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। গলার কাছে কী যেন আটকে গেল।
তারপর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “একটু পরে এনে দেব, মা।”
মায়া আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। ছোটরা বাবার কথা সহজেই বিশ্বাস করে। হয়তো করাটাই স্বাভাবিক।
অভিক বাইরে বেরিয়ে উঠোনে দাঁড়াল। তিন মাস হলো কাজ নেই। গ্যারেজের হেল্পারের কাজটা চলে গেছে বৈশাখের শুরুতে। ঈদের আগে কত জায়গায় ঘুরেছে—নিউমার্কেটের গলি, কাপড়ের গোডাউন, এমনকি রিকশার গ্যারেজেও। কোথাও লোক লাগবে না।
ঘরে যা টাকা ছিল, চাল-ডাল আর মায়ের প্রেশারের ওষুধ কিনতেই শেষ। শেষ বিশ টাকা দিয়ে গতকাল আধা কেজি সেমাই এনেছে নিশি।
নিশি এসে পাশে দাঁড়াল। “ওকে কী বললে?”
“বলেছি, পরে এনে দেব।”
নিশি শুধু মাথা নাড়ল। শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাচ্ছে।
সকালের দিকে পাশের বাড়ির বাচ্চারা নতুন জামা পরে বের হলো। লাল, নীল, হলুদ। হইচই, হাসাহাসি। বেলুন ফোলাচ্ছে কেউ।
মায়া দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিল। পায়ের নখ খুঁটছে। একটু পর এসে বলল, “বাবা, দোকান এখনও খোলেনি?”
অভিক হেসে বলার চেষ্টা করল। হাসিটা ঠিক হলো না। “আর একটু পরে খুলবে।”
মায়া আবার অপেক্ষা করতে লাগল। উঠোনের এক কোণে বসে পিঁপড়ে গুনছে।
দুপুরে অভিক বাজারে গেল। পকেটে একশো কুড়ি টাকা। গরমে শার্ট ভিজে গেছে। একটা জামার দাম জিজ্ঞেস করেই বেরিয়ে এল। চারশো পঞ্চাশ। সবচেয়ে কম।
ফেরার পথে রাস্তার পাশের ভ্যান থেকে দুটো রঙিন ফিতা কিনল। লাল আর গোলাপি। বিশ টাকা।
বাড়িতে ঢুকতেই মায়া দৌড়ে এল। “জামা এনেছ?”
অভিক হাঁটু গেড়ে বসল। ধুলো লেগে গেল প্যান্টে। ফিতা দুটো মেয়ের হাতে দিয়ে বলল,
“আজ জামা হলো না, মা। এটা আগে রাখ।”
মায়া ফিতা দুটো দেখল। আঙুলে পেঁচিয়ে দেখল।
তারপর হেসে বলল, “তাহলে এগুলোই পরব।”
বলেই ভেতরে দৌড়ে চলে গেল। চটিটা খুলে গেল একটা।
নিশি মুখ ফিরিয়ে নিল। জানালার শিক ধরে দাঁড়াল। অভিক দেখেও কিছু বলল না। বলার ছিল না কিছু।
বিকেলে মায়া পুরোনো ফ্রকটা পরে উঠোনে খেলছিল। ফ্রকের নিচে সেলাই খুলে গেছে একটু। চুলে নতুন ফিতা, দুইটা ঝুঁটি।
পাশের বাড়ির এক মহিলা, রহিমা খালা, জিজ্ঞেস করলেন, “নতুন জামা হয়নি?”
মায়া হেসে বলল, “হবে। বাবা পরে কিনে দেবে।”
অভিক দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়ে ছিল। চৌকাঠে হাত। সামনে যাওয়ার সাহস হলো না। বুকের ভেতরটা কেমন ভার।
রাতে মায়া ঘুমিয়ে পড়ার পর সে পাশে গিয়ে বসল। হারিকেনের আলো কমিয়ে দিয়েছে নিশি। চুল থেকে ফিতা দুটো খুলে বালিশের পাশে রাখল। মায়ার কপালে হাত রাখতেই মায়া ঘুমের মধ্যেই বাবার আঙুলটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
ছোট্ট হাত। গরম। অভিক আর হাত সরাল না। বসে রইল।
বাইরে তখন আতশবাজির শব্দ। দূরে কোথাও। থেমে থেমে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।