অব্যক্ত কষ্টের গল্প
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন |
ছোটগল্প | জানুয়ারি ২৬, ২০২৬
রিয়া কখনো হাসি বন্ধ করত না। চারপাশের মানুষ বলত, “তোর হাসি সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।” কিন্তু এই হাসি ছিল এক খাঁচার ভেতরে আটকে থাকা আত্মার প্রতিফলন। সমাজ তাকে কখনো আলোকিত দেখত না—শুধু বিচার করত, পরীক্ষা করত, আঘাত করত।
রিয়ার জীবন শুরু হয়েছিল স্বপ্নময়। ছোট শহরে জন্ম, ছোট পরিবার। ভালোবাসার প্রথম চুম্বন, প্রথম ফুল—সবই ভেতরে ভেতরে ভেঙে দিয়েছিল। সে বিশ্বাস করেছিল—বিয়েতে শান্তি, নিরাপত্তা, সামাজিক স্বীকৃতি। কিন্তু বাস্তবতা?
সমাজ ছিল একরোখা, নিষ্ঠুর।
স্বামী প্রথম বছর ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,
“তুমি আছ তাই আমি পুরো জীবন উপভোগ করতে পারি।”
কিন্তু সময়ের সঙ্গে কথাগুলো উড়ে গেল। স্বামী ব্যস্ত, ঘরে উপস্থিত কিন্তু অদৃশ্য। মুখে কথা নেই, চোখে আগুন নেই।
রিয়া বারবার প্রশ্ন করত,
“আমাদের সম্পর্ক কোথায় হারাল?”
“সব ঠিক আছে,” আসত ঠাণ্ডা উত্তর।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রিয়া দেখল ঘর ফাঁকা। আলমারি ছেঁড়া, জিনিস বিছিন্ন। শুধু একটি খোলা চিঠি—
“আমি চলে যাচ্ছি। আর ফিরে আসব না।”
কিছুই বলা নেই, ব্যাখ্যা নেই। শুধু ফাঁকা।
সমাজের চোখ আরও ভয়ঙ্কর ছিল। পাড়ার মানুষ ফিসফিস করত—“ডিভোর্সড, একা, ঝগড়াটে।”
আত্মীয়রা বারবার প্রশ্ন করত—“তুই কি ঠিকভাবে সংসার চালাতে পারলি না?”
বন্ধুরা দূরে সরে গেল। অফিসের সহকর্মীরা হেসে বলত,
“একাই তো জীবন কাটাতে হবে, তাই না?”
প্রতিটি পদক্ষেপ মনে করাত—তুই ভুলে গেছ, তোর কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। বাজারে কেউ তাকালে কেঁপে যেত। লাঞ্চরুমে সহকর্মীদের হাসি যেন ভাঙা কাচের শব্দ।
একদিন, বাসায় ফেরার পথে প্রতিবেশী আন্টি বলল—“রাতের দরজা ঠিকঠাক লাগিয়ে রাখবি। একা তো থাকছিস।”
“একা।” এই শব্দটাই ছিল সবচেয়ে জোরালো চিৎকার।
রিয়া জানত, একা থাকার মানে শুধু নিঃসঙ্গতা নয়। এটি ছিল সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, লজ্জা, চুপচাপ ক্ষমতার হার। সে নিজেকে শূন্য মনে করল।
ছোট অভ্যাস—জানালার কাচে ছোট বৃত্ত আঁকা। প্রতিদিন, নিঃশব্দে। কোনো অজানা বোঝাপড়া, কোনো আর্তনাদ। শুধু তার নিজের।
এক রাত, জানালার পাশে বসে রিয়া ভাবল—পৃথিবী কি তার জন্য তৈরি নয়? চারপাশে আলো ঝলমল করছে, মানুষ যাচ্ছে আসছে, কেউ থামছে না।
হঠাৎ ফোন। অজানা নাম্বার। কণ্ঠ—শান্ত, কিন্তু ভেতরের কিছু নড়াচড়া করল।
“রিয়া, শুনেছি তুমি একা।”
হৃদয় কেঁপে উঠল। সে ফোন নামিয়ে রাখল। মিনিট দশেক পর মেসেজ— “চুপচাপ বসে থাকিস না। কথা বলি।”
রিয়া ফোন ধরতে পারে না। মনে হলো, ফোনটা যেন ফাঁদ। এই সমাজে ডিভোর্সি মেয়েদের জন্য ফোন মানে—প্রশ্ন, হুমকি।
সে ফোন রাখল। আঙুল কাঁপছে। চোখ ভিজে। কানের ভেতর শূন্যতা। চারপাশ নিঃশব্দ।
রিয়ার ঘরের বাতি নিভে গেল। জানালার পাশে চুপচাপ বসে রইল। বাইরে লাইট জ্বলছে, মানুষ চলছে, কেউ থামছে না।
চোখ আকাশের দিকে। মনে প্রশ্ন ঘুরছে— “এই শহরে, এই সমাজে, ডিভোর্সি মেয়ের জন্য কি কোনো জায়গা আছে?”
শূন্যতা ভরিয়ে রাখল এক ছোট কাজ—রিয়া চিঠি ছিঁড়ে জানালার পাশে রেখে দিল। পাতাগুলো বেসরকারি বাতাসে হেলে পড়ল, যেন নিঃশব্দে বিদায় বলছে।
তার চোখ জানালার কাচের ছোট বৃত্তে ফিরে গেল—প্রতিদিন আঁকা সার্কুলার নিঃশ্বাস, তার একাকীত্বের নিদর্শন।
আর এক বাক্যে ভবিষ্যতের সংঘাতের ইঙ্গিত—সে জানত, এই নিঃশব্দ একা থাকা আরও গভীর বিপর্যয়ের শুরু হতে পারে।
শুধু একটি জিনিস নিশ্চিত—সে আর আগে মতো হাসবে না।
#অব্যক্তকষ্টেরগল্প #ডিভোর্সি_নারী
#সামাজিক_চাপ #নীরব_ট্র্যাজেডি
#নারীর_অদেখা_যুদ্ধ #পরের_অধ্যায়
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।