বৃষ্টির ভেতর যে গল্প জন্ম নেয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । এপ্রিল ৩০, ২০২৬
বৃষ্টি নামছিল সেদিন অদ্ভুতভাবে ধীর লয়ে। না ঝড়, না টুপটাপ শব্দের তাড়া—বরং এমন এক স্থিরতা, যেন শহরটাকে একটু সময় নিয়ে ভিজিয়ে দিতে চায়। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভিজছিলামও, কিন্তু সেটাকে পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত বলা যায় না। আশপাশে মানুষ ছিল, গাড়ির আলো কেটে যাচ্ছিল, দোকানের ভেতর আলো জ্বলছিল—তবুও এই সবকিছু যেন আলাদা এক স্তরে ঘটছে। আমার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঠিক বসছিল না।
কপাল বেয়ে নামা ফোঁটাগুলো চোখের কোণে এসে জমছিল। এই ভেজা কোথা থেকে শুরু হচ্ছে, সেটা আলাদা করে বোঝা কঠিন। কিছু অনুভূতি থাকে—বৃষ্টি আর ভেতরের চাপ—যেগুলো আলাদা করা যায় না সহজে। শুধু বোঝা যায়, কিছু একটা ধীরে ধীরে হালকা হচ্ছে।
পায়ের নিচে জমে থাকা ধুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়ে গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সেই গন্ধের একটা নিজস্ব স্মৃতি-ক্ষমতা আছে। হঠাৎ করে মনে পড়ছিল কোনো এক বিকেল—পুরোটা স্পষ্ট না, তবুও তার একটা আবহ আছে। সেই আবহটা ফিরে আসছিল, অপ্রত্যাশিতভাবে।
এই একই রাস্তায়, খুব বেশি দিন আগে না, একা ছিলাম না।
ছাতা ভাগাভাগি করে হাঁটা—এটা আসলে যতটা সহজ শোনায়, ততটা না। এর ভেতরে একটা নীরব ঘনিষ্ঠতা থাকে। ভেজা হাত ধরা, হঠাৎ করে হাসি—কোনো কারণ ছাড়াই। তখন বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা আলাদা করে চোখে পড়ত। এখন মনে হয়, সেই সময়টাকে আমরা একটু বেশি অর্থ দিয়ে ফেলেছিলাম। তখন যা স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, আজ সেটা দূরের কিছু।
পাশেই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। বয়স খুব বেশি না—আট কিংবা নয়। সে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল অদ্ভুত স্থিরতায়। তার ভেতরে কোনো অস্থিরতা চোখে পড়ছিল না। হাত বাড়িয়ে ফোঁটা ধরার চেষ্টা করছিল। একটার পর একটা। বেশিরভাগই হাত ফসকে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু সে থামছিল না।
এই দৃশ্যটা অকারণে মনে আটকে গেল।
কিছু বলতে ইচ্ছে হয়েছিল। বলা হয়নি। সব কথা বলার জন্য না—কিছু কথা ভেতরে থাকলেই ঠিক থাকে।
হঠাৎ বৃষ্টি একটু জোরে নামল। আশপাশের মানুষজন ছুটে গিয়ে দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়াল। জায়গাটা ফাঁকা হয়ে এল। ভিজে থাকার জন্য যেন একটু বেশি জায়গা পাওয়া গেল। দাঁড়িয়ে রইলাম। এই ভিজে থাকাটা এড়িয়ে গেলে কিছু একটা অসম্পূর্ণ থেকে যেত—এমন একটা বোধ কাজ করছিল।
পায়ের নিচে পানি জমে ছিল। হাঁটা শুরু করতেই ছিটকে উঠছিল। প্রতিটা পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল, শুধু সামনে এগোচ্ছি না—কিছু পেছনেও ফেলে যাচ্ছি। একটা সম্পর্ক, যার শেষটা স্পষ্ট ছিল না, সেটার ভেতর থেকে বের হয়ে আসার মতো অনুভূতি। ধীরে ধীরে, কোনো ঘোষণা ছাড়া।
একটা দোকানের সামনে এসে থামলাম। ভেতরে নরম আলো। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। কয়েকজন মানুষ বসে গল্প করছে—তাদের হাসির শব্দ বাইরে পর্যন্ত ভেসে আসছে। দৃশ্যটা খুব সাধারণ, কিন্তু তাতে একটা ধারাবাহিকতা আছে। জীবন থেমে থাকে না—এই কথাটা আলাদা করে বলা না হলেও বোঝা যায়।
ভেতরে ঢুকলাম না।
সব মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার জন্য না। কিছু সময় একা থাকলে তবেই ঠিকমতো ধরা পড়ে।
আকাশ তখন একটু পরিষ্কার হচ্ছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে আলো বেরোচ্ছে—খুব বেশি না, তবুও উপস্থিত। সেই আলো দেখেই মনে হলো, শেষ হয়ে যাওয়ার চেয়ে বদলে যাওয়া কথাটা হয়তো বেশি ঠিক। বৃষ্টি থামে, রাস্তা শুকায়—কিন্তু মাটির গন্ধটা কিছুক্ষণ থাকে। কিছু সম্পর্কও তেমন—শেষ হয়ে যায়, কিন্তু চিহ্ন মুছে যায় না।
রাস্তার পাশে একটা ফুলগাছ। বৃষ্টিতে ভিজে ফুলগুলো আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। পাপড়ির ওপর পানি জমে আছে, আলো পড়লে একটু ঝিলিক দিচ্ছে। দাঁড়িয়ে রইলাম। কোনো নাটকীয়তা নেই, তবুও মন আটকে যায়। ভিজে যাওয়ার মধ্যেও একটা আলাদা রূপ আছে—এটা হয়তো আগে খেয়াল করিনি।
শরীরটা আগের মতো ভারী লাগছিল না। পুরোটা হালকা না, কিন্তু একটা পরিবর্তন ছিল—চাপটা একটু নরম হয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে পেছনে তাকালাম না। ইচ্ছে করেই না। সব পথ ফিরে দেখার জন্য না—কিছু পথ কেবল সামনে এগোনোর দাবি করে।
মোড়ের কাছে এসে থামলাম এক মুহূর্ত। হালকা করে তাকালাম পেছনের দিকে। ছেলেটা আর নেই। রাস্তার ওপর ছোট ছোট গোল দাগ পড়ে আছে—যেখানে সে ফোঁটা ধরার চেষ্টা করছিল। দাগগুলো খুব বেশি সময় থাকবে না, একটু পরেই মিলিয়ে যাবে। তবুও এই মুহূর্তে তারা আছে।
বৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে। শুধু হালকা ফোঁটা পড়ছে—শেষের দিকের অনিচ্ছুক উপস্থিতি।
রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। পানি জমে থাকা জায়গাগুলোতে সেই আলো ভেঙে যাচ্ছে। কোথাও সোজা, কোথাও দুলে উঠছে। শহরটা আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে—অথবা হয়তো কখনো ছন্দ ভাঙেইনি, আমি-ই একটু বাইরে সরে গিয়েছিলাম।
আশপাশের আওয়াজগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে এবার—গাড়ির হর্ন, দূরের মানুষের কথা, দোকানের ভেতরের কোলাহল।
থামলাম একবার। শ্বাস নিলাম।
মনে মনে বললাম, “ধন্যবাদ।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।