নিজের মতো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১ নভেম্বর ২০২৬
বিকেল পাঁচটার দিকে রফিক সাহেব বারান্দার চেয়ারটায় বসেন। হাতে এক কাপ চা, পাশে পুরোনো একটা খবরের কাগজ। চায়ে চিনি দেন না। খবরের কাগজের সব খবরও পড়েন না। মাঝেমধ্যে একটা পাতা উল্টে বাইরে তাকিয়ে থাকেন।
পাশের ফ্ল্যাটের মিজান সাহেব একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন,
—ভাই, সারাদিন একা একা থাকেন কীভাবে? বিরক্ত লাগে না?
রফিক সাহেব হেসে বলেছিলেন,
—বিরক্ত হলে তো সঙ্গী খুঁজতাম।
কথাটা শুনে মিজান সাহেব হেসেছিলেন। কিন্তু তাঁর হাসির মধ্যে একটু অবিশ্বাস ছিল।
রফিক সাহেবের বয়স ষাটের কাছাকাছি। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বছর পাঁচেক হলো। স্ত্রী মারা গেছেন আট বছর আগে। একমাত্র মেয়ে থাকে কানাডায়। বছরে একবার দেশে আসে। ফোনে কথা হয়, ভিডিও কলে নাতির মুখও দেখেন। মেয়ের সংসার ভালো চলছে। এই খবরটুকুই তাঁর কাছে যথেষ্ট।
স্ত্রী মারা যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা বছর তিনি একা থাকতে পারতেন না। রাতের খাবার খেতে বসে বারবার মনে হতো, কেউ একজন বুঝি রান্নাঘর থেকে ডাকবে। সকালে ঘুম ভাঙলে মনে হতো, পাশের মানুষটা হয়তো একটু পরেই উঠে চা বানাবে।
একসময় তিনি টেলিভিশন চালিয়ে ঘুমাতেন। ঘরে শব্দ না থাকলে তাঁর বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হতো। পরিচিত মানুষদের ফোন করতেন। কেউ ব্যস্ত থাকলে আবার ফোন করতেন। পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। আড্ডায় বসে অন্যদের কথা শুনতেন, কিন্তু বাসায় ফিরে দরজা বন্ধ করার পর মনে হতো, সারাদিন এত মানুষের মধ্যে থেকেও তাঁর নিজের জন্য কেউ নেই।
একদিন মেয়ে ফোন করে বলেছিল,
—বাবা, তুমি চাইলে আমার কাছে চলে আসতে পারো। এখানে তোমার একা থাকতে হবে না।
রফিক সাহেব সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেননি।
মেয়ের কথায় ভালোবাসা ছিল, দায়িত্ববোধ ছিল। কিন্তু নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্যের সংসারে গিয়ে থাকার কথা ভাবতেই তাঁর কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল।
তিনি জানতেন, মেয়ে তাঁকে যত্ন করবে। নাতি দাদুর সঙ্গে খেলবে। জামাইও যথেষ্ট সম্মান করে। তবু সকালবেলা কখন ঘুম থেকে উঠবেন, কখন গোসল করবেন, দুপুরে কী খাবেন, বিকেলে কোথায় বসবেন, এসবের জন্য অন্য কারও সময়ের সঙ্গে নিজের সময় মেলাতে হবে।
তিনি মেয়েকে বলেছিলেন,
—এখনই যাচ্ছি না মা। তোদের কাছে বেড়াতে যাব। কিন্তু নিজের ঘরটা ছেড়ে থাকতে মন চায় না।
মেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
—তুমি একা থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছ, বাবা।
রফিক সাহেব সেদিন কথাটার উত্তর দেননি।
আসলে অভ্যস্ত হওয়া আর ভালো থাকা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটা বুঝতে তাঁর আরও সময় লেগেছিল।
স্ত্রী মারা যাওয়ার দ্বিতীয় বছরে একদিন তিনি বাজার থেকে একটা ছোট মানিপ্ল্যান্ট কিনে এনেছিলেন। বারান্দার এক কোণে টবে লাগিয়ে পানি দিতেন। প্রথম কয়েক সপ্তাহ গাছটার কোনো পরিবর্তন দেখেননি। পরে এক সকালে দেখলেন, পুরোনো পাতার পাশে নতুন একটা পাতা বের হয়েছে।
পাতাটা এত ছোট যে চোখে না পড়লেও চলত।
কিন্তু সেদিন অফিসে যাওয়ার তাড়া ছিল না, কারও জন্য নাশতা বানানোর দায় ছিল না। তিনি চেয়ার টেনে গাছটার সামনে বসে রইলেন। পাতাটা একটু বড় হয়েছে কি না, সেটাই দেখছিলেন।
সেই প্রথম তাঁর মনে হয়েছিল, দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কাউকে দিয়ে পূর্ণ করে রাখতে হয় না।
এরপর থেকে ছোট ছোট কিছু কাজ নিজের জন্য জমিয়ে রাখতে শুরু করলেন।
বাজারে গেলে নিজের পছন্দের মাছ কিনতেন। দুপুরে রান্না করতে ইচ্ছে না করলে ডিম ভেজে ভাত খেতেন। শুক্রবার সকালে পুরোনো গান শুনতেন। কখনো বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তেন। ঘুম ভাঙার পর নিজেকে কারও কাছে কৈফিয়ত দিতে হতো না।
একদিন রাতে স্ত্রীর ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছবিটা শোবার ঘরের আলমারির ওপর রাখা। বিয়ের পরের বছরের ছবি। স্ত্রীর মুখে তখনকার সেই চেনা হাসি।
ছবিটার ওপর ধুলো জমেছিল। রফিক সাহেব আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে ছবিটা নামিয়ে মুছলেন। কিছুক্ষণ হাতে ধরে রাখলেন। তারপর আগের জায়গায় রেখে দিলেন।
ছবির দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হলো, মানুষটা থাকলে ভালো হতো। অনেক কথা বলা যেত। বিকেলে একসঙ্গে চা খাওয়া যেত। বাজার থেকে মাছ কিনে এনে দুজনে মিলে রান্নার গল্প করা যেত।
কিন্তু ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আর আগের মতো ভেঙে পড়লেন না।
জানালাটা একটু খুলে দিয়ে ঘুমাতে গেলেন।
এর মধ্যে একদিন মেয়ে ফোন করে জানাল, সামনের মাসে দেশে আসবে। বাবাকে নিয়ে কয়েক দিন কক্সবাজার ঘুরতে যেতে চায়।
রফিক সাহেব খুশি হলেন। মেয়ের সঙ্গে সময় কাটাতে তাঁর ভালো লাগে। নাতির দুষ্টুমি দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু মেয়ে যখন বলল, এবার যাওয়ার সময় বাবাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে, তখন তিনি একটু থামলেন।
—কেন মা?
—একা থাকো বলে চিন্তা হয়। তোমার বয়স হচ্ছে। কিছু হলে কে দেখবে?
—কিছু হলে তোমাকে ফোন করব।
—বাবা, সবকিছু কি ফোন করে সামলানো যায়?
রফিক সাহেব বুঝলেন, মেয়ের চিন্তাটা অমূলক নয়। বয়স বাড়ছে। অসুস্থ হলে পাশে কাউকে পাওয়া দরকার। কিন্তু শুধু একা থাকেন বলেই তিনি অসহায়, এই ধারণাটা তাঁর ভালো লাগল না।
তিনি বললেন,
—শোন মা, একা থাকি বলে আমার দিনগুলো খারাপ কাটে না। তোর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে, তোরা এলে আরও ভালো লাগে। কিন্তু সারাক্ষণ কাউকে পাশে না পেলে আমার জীবন থেমে থাকে না।
মেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তুমি আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছ।
—হয়তো নিজের সঙ্গে একটু পরিচয় হয়েছে।
কথাটা বলেই তিনি হেসে ফেললেন।
পরের মাসে মেয়ে এল। বাড়িতে কয়েক দিন বেশ হৈচৈ হলো। নাতি দাদুর টবের গাছ থেকে পাতা ছিঁড়তে গিয়ে বকা খেল। মেয়ে বাবার আলমারি গোছাতে গিয়ে পুরোনো একটা পাঞ্জাবি বের করল। জামাই বাজার থেকে মিষ্টি আনল।
রফিক সাহেবের ভালো লাগছিল।
কিন্তু মেয়ের ফেরার দিন সন্ধ্যায় বাড়িটা আবার চুপচাপ হয়ে গেল।
নাতির খেলনা পড়ে ছিল সোফার নিচে। রান্নাঘরের টেবিলে মেয়ের রেখে যাওয়া একটা চুলের ক্লিপ। ফ্রিজে দুটো মিষ্টির বাক্স।
আগে এমন সন্ধ্যায় তাঁর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠত। মনে হতো, সবাই চলে গেল, আবার সেই একা ঘর।
সেদিন তিনি খেলনাটা তুলে রাখলেন। চুলের ক্লিপটা ড্রয়ারে রেখে দিলেন। ফ্রিজ থেকে একটা মিষ্টি বের করে খেলেন।
তারপর বারান্দায় গিয়ে গাছে পানি দিলেন।
মোবাইলটা বেজে উঠল। মেয়ের ফোন।
—বাবা, বাসায় পৌঁছেছ?
—আমি তো বাসাতেই আছি মা।
—মানে, সব ঠিক আছে তো?
—হ্যাঁ। তুই চিন্তা করিস না।
—আজ রাতে খেয়ো কিন্তু।
—খাব। তুইও ঠিকমতো খেয়ে নিস।
ফোনটা রেখে তিনি কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
আকাশে তখন সন্ধ্যার শেষ আলো। পাশের বাড়ির ছাদে কয়েকটা কাপড় শুকাতে দেওয়া। দূরে কোথাও প্রেসার কুকারের সিটি বাজছে। নিচের রাস্তা দিয়ে একজন বাদামওয়ালা হাঁক দিচ্ছে।
পৃথিবী নিজের নিয়মে চলছিল।
রফিক সাহেব ঘরে ঢুকে ভাত বসালেন। সঙ্গে একটা ডিম ভাজলেন। খাওয়া শেষে নিজের প্লেট নিজেই ধুয়ে রাখলেন।
রাত দশটার দিকে বই নিয়ে বিছানায় গেলেন। পড়তে পড়তে একটা জায়গায় এসে থেমে গেলেন। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, রাস্তার বাতিটা জ্বলছে। তার নিচে একটা কুকুর গোল হয়ে শুয়ে আছে।
তিনি বাতি নিভিয়ে দিলেন।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি বারান্দায় গেলেন।
মানিপ্ল্যান্টের নতুন পাতাটা আগের চেয়ে একটু বড় হয়েছে।
তিনি আঙুল দিয়ে পাতাটার কিনারা ছুঁয়ে দেখলেন। তারপর নিজের কাপটা হাতে নিয়ে চেয়ারে বসলেন।
সেদিন তাঁর কোথাও যাওয়ার কথা ছিল না। কারও আসারও কথা ছিল না।
তবু সকালটা তাঁর কাছে একটুও ফাঁকা মনে হলো।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।