গোলাপের রঙের ভাষায় ভালোবাসার গল্প
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভালোবাসা সপ্তাহের শুরু, গোলাপ দিবস। শহরের বুকে যেন এক অদ্ভুত উত্তাপ—ফুলের দোকানগুলোতে ভিড়, তরুণ-তরুণীদের হাসি-কান্না, আর রাস্তা জুড়ে রঙিন আভা।
কিন্তু সিটি কলেজের ঠিক বিপরীতে থাকা পুরনো পার্কে সেই উত্তাপ পৌঁছায়নি। বিকেলের মৃদু বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে যাচ্ছে, আর বেঞ্চের ওপর বসে আছে অভিক আর নিশি।
দুজনের মাঝে কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব, কিন্তু মনে হচ্ছে তা কয়েক হাজার মাইল। নিশি বারবার তার মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখছে, আর অভিকের হাতে একটা বড় কাগজে মোড়ানো প্যাকেট, যা ওজনের চেয়ে বেশি বোঝা যেন তার বুকের চাপ। কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে।
“তুমি আসবে না বলে জানাতাম,” অভিক অবশেষে বলল। তার গলা শুকিয়ে গেছে। “তবু আমি ভেবেছিলাম, হয়তো শেষবারের মতো...”
নিশি স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল। তার চোখে ক্লান্তি আর একটু রাগ।
“শেষবারের মতো মানে কী, অভিক?
আমাদের সম্পর্কটাই কি এমন, যে একটা দিন উদযাপন করার জন্য আলাদা হতে হবে?”
অভিক কিছু বলল না। সে ধীরে ধীরে ব্যাগটা খুলল। ভেতরে থাকা গোলাপগুলো বাতাসে দুলে উঠল। রঙে রঙে ভরা ঝুড়ি যেন প্রত্যেকটি মুহূর্তের গল্প বলতে চায়। অভিক প্রথমে একটি উজ্জ্বল হলুদ গোলাপ হাতে নিয়ে নিশির দিকে এগিয়ে দিল।
“ওটা কী?” নিশি জিজ্ঞেস করল।
“এইটা সেই দিন,” অভিক বলল, চোখে আবেগ। “তোমার বাড়ির সামনের হলুদ আম গাছটা মনে আছে? স্কুল থেকে ফেরার পথে আমরা দুজনে সেখানে দাঁড়িয়ে আমের গায়ে পাথর মারতাম। বৃষ্টি ভেজা পথে ভ্যাপসা গন্ধ, আর তোমার হাতের ব্যাগের ফিতাটা—সেই দিনগুলোতে ছিল শুধু 'আমরা', কোনো 'আমি' বা 'তুমি' ছিল না। হলুদ রোদ, হলুদ ফুল—ওই বন্ধুত্বের উষ্ণতা ছাড়া আজ আমি তোমার সামনে দাঁড়াতে পারতাম না।”
নিশির চোখে অদ্ভুত নীরব ছায়া ফুটে উঠল। সে চুপ করে রইল। অভিক তখন একটা নরম গোলাপি এবং একটি সাদা গোলাপ বের করল।
“এই দুটো আমার অসম্মানের প্রতীক,” সে বলল। “গোলাপিটা ওই দিনের, যখন তুমি অফিসে প্রমোশন পেয়েছিলে। আমি ঈর্ষার ছায়ায় ভরা, কিন্তু তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চেয়েছিলাম। আর সাদাটা—ওই দিন, যখন তুমি আমাকে ক্ষমা করেছিলে, সেই নির্দোষ বিশ্বাস আমাকে বাঁচিয়েছে। আমি তোমাকে সাদা ফুল দিয়েছিলাম শ্রদ্ধা জানাতে, কিন্তু ভেতরে জানতাম, তুমি আমার বড় মনের সামনে এক অনন্য উদারতার প্রতীক।”
নিশি কিছু বলতে পারল না। গোলাপি আর সাদা ফুল দুটো তার কোলে পড়ে ছিল। অভিক এবার একটা ঝকঝকে কমলা এবং একটা রহস্যময় বেগুনি গোলাপ বের করল।
“এগুলো আমার অজ্ঞতা আর উত্তেজনার কথা বলে। বেগুনিটা সেই প্রথম দেখার কথা মনে করিয়ে দেয়—কলেজের প্রথম দিন তোমাকে দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। জানতাম না তুমি কে, তবু মনে হয়েছিল যেন আমরা একে অপরকে হাজার বছর ধরে চিনি। আর কমলাটা—আমার সেই বাস্তববোধহীন প্রেমের শুরু। মনে আছে, আমি স্বপ্ন দেখতাম, ভেবেছিলাম পৃথিবীতে তোমাকে ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের ছোটখাটো অভিমানে ফেলে দিয়েছিল।”
নিশির চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা জল। সে তা মুছতেও পারল না।
অভিক এবার একটি লাল গোলাপ হাতে নিল। চারপাশের সব শব্দ থেমে গেল। ট্রাফিকের হর্ন, দূরের কোলাহল, পাখির ডাক—সব মিলিয়ে গেল। শুধু লাল আর লাল।
“এটা আমার বর্তমান,” অভিক ফিসফিস করল। “প্রেম। আগুন। একা থাকতে না পারার ব্যথা। আমি জানি, আমরা দুজন দুজনকে ব্যথা দিয়েছি, অপমান করেছি। কিন্তু এই লাল গোলাপটা বলে—আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারি না। ভুলগুলো ভুল হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু এই অনুভূতিটা মিথ্যে নয়। আমি এখনও তোমাকে সেই চোখে চাই, যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম। এই লাল আগুন আমার বুকে এখনও জ্বলছে।”
নিশি লাল গোলাপটা হাতে নিল। রক্তিম রঙটা যেন তার নিজের হৃদস্পন্দন হয়ে ধরা দিল। চোখে আর কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো অভিযোগ নেই, শুধুই গভীর হ্যাঁ। তারা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল। কথার প্রয়োজন নেই, শুধু হৃদস্পন্দনের শব্দ প্রকাশ পেল নীরবতার ভেতর।
বেঞ্চের ওপর তখন সাজানো হয়েছে হলুদ, গোলাপি, সাদা, কমলা, বেগুনি আর লাল। সব মিলিয়ে এক সুন্দর বিশৃঙ্খলতা। সূর্য তখন অস্তাচলে, আকাশ রক্তিম লাল, বাতাসে ভেসে আসে দূরের মসজিদের আজানের শব্দ। নিশি অভিকের কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, “বাকি সব রঙ মুছে গেছে, অভিক, শুধু এটাই যথেষ্ট।”
পুরনো পার্কের বেঞ্চে দুটি মানুষ বসে আছে, আর তাদের মাঝখানে একটি রঙ—যা সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে, সব অভিমান ভেঙে দিয়েছে, আর সব কথা বলে দিয়েছে। ভালোবাসার ভাষায় কথা বলার দরকার হয় না, ফুলের পাপড়িই যথেষ্ট।
গোলাপ দিবসের শুভেচ্ছা! ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন—রঙ দিয়ে, হৃদয় দিয়ে।
#গোলাপ_দিবস #RoseDay2026 #ভালোবাসার_রঙ #ভ্যালেন্টাইনসউইক #রঙের_ভাষা #প্রেম #বন্ধুত্ব #শুভেচ্ছা #ফুলপ্রেম #রঙে_ভালোবাসা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।