শরতের বিকেলের আকাশে সোনালি আভা ছড়িয়ে আছে। নদীর জলে ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘের টুকরো, বাতাসে আছে কদমফুলের গন্ধ। নদীর ধারে বসে অভিক চুপচাপ তাকিয়ে আছে ঢেউয়ের দিকে। তার মনে ভাসছে একটাই বাক্য—
“মাঝে মাঝে জীবনটাকে বড় বিচিত্র লাগে। নদীর মতোন বহমান জীবনে তোমার আসাটা অনেকটা প্রত্যাশিত আর অর্থবহ ছিল।”
এই কথাগুলো তার ঠোঁট ফিসফিস করে উচ্চারণ করছে। কিন্তু পাশে কেউ নেই। শুধু নদী, বাতাস আর এক অনন্ত নীরবতা। অথচ অভিক জানে, এই কথাগুলো কেবল নিশির জন্যই।
অভিকের জীবন সবসময়ই ছিল একঘেয়ে। অফিস, বাসা আর নিঃসঙ্গতা—এই তিনের ভেতরেই বন্দী ছিল তার পৃথিবী। বন্ধুরা বলত, “তুই বড্ড চুপচাপ, তোর মধ্যে হাসি নেই।” কিন্তু অভিক হাসতে জানত না, বা হয়তো ভুলে গিয়েছিল।
একদিন বিকেলে নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে দেখা হলো নিশির সাথে। সে বসেছিল ঘাটের সিঁড়িতে, পা পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল। অভিকের উপস্থিতি টের পেয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বলল—
“আপনি কি সবসময় একা হাঁটেন?”
অভিক চমকে উঠল। এই সহজ প্রশ্নের ভেতর যেন তার সমস্ত নিঃসঙ্গতা উন্মোচিত হয়ে গেল। কেউ এত সহজে তাকে পড়ে ফেলবে, তা সে কল্পনাও করেনি।
সেদিন থেকে তাদের আলাপ শুরু হলো। ছোট ছোট কথোপকথন ধীরে ধীরে গড়িয়ে গেল দীর্ঘ সময়ের আড্ডায়। নদীর ধারে বসে গল্প করা, আকাশের মেঘ গোনা, বাতাসে ভেসে আসা কদমফুলের গন্ধ ভাগাভাগি করা—সবকিছু যেন হঠাৎ করে অভিকের জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করল।
নিশির চোখে ছিল অদ্ভুত আলো। সেই চোখে তাকালে অভিক অনুভব করত, সে একা নয়। নদীর স্রোতের মতো তাদের সম্পর্ক চলতে শুরু করল—অন্তহীন, বহমান, আর অনিবার্য।
অভিক ভাবত, নিশি তার জীবনের পূর্ণতা। নিশি তাকে বলত—
“জানো, অভিক, নদীর মতো সম্পর্কেরও স্রোত আছে। কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বহমান।”
অভিক মৃদু হেসে জবাব দিত—
“তুমি যদি আমার নদী হও, তবে আমি তোমার তীর হতে চাই। যেখানে তোমার ঢেউ এসে ঠেকে, আমি সেখানেই থাকব।”
এই সহজ বাক্যগুলোতেই গড়ে উঠছিল তাদের ভালোবাসার গভীরতা। অভিক বুঝতে শুরু করেছিল, জীবনের মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং কারও আগমনের মাধ্যমে বেঁচে ওঠা।
কিন্তু সুখের গল্পের ভেতরও লুকিয়ে থাকে অপ্রত্যাশিত বাঁক। হঠাৎ করেই নিশির শরীর ভেঙে পড়তে লাগল। প্রথমে সামান্য জ্বর, তারপর ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর রোগ তার শরীরকে গ্রাস করল।
হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতর অভিক প্রথমবারের মতো অসহায় হয়ে পড়ল। দিন রাত নিশির পাশে বসে থাকত সে। এক রাতে নিশির হাত ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“তুমি না থাকলে আমার জীবনও থেমে যাবে, নিশি।”
নিশি মৃদু হেসে চোখ তুলে তাকাল,
“অভিক, নদী কি কখনো থেমে থাকে? আমি যদি না থাকি, তবুও তুমি বয়ে চলবে। আমি তোমার স্রোতে থেকে যাব।”
অভিক কান্না চেপে বলল,
“কিন্তু নদী যদি তীর হারায়?”
নিশি মৃদু গলায় উত্তর দিল—
“তীর সবসময় থাকে, অভিক। শুধু চোখের দৃষ্টিতে নয়, হৃদয়ের ভেতরেও।”
এক শরতের রাতে নিশি নিঃশব্দে হারিয়ে গেল। অভিকের কোলের ওপর মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ফেলল সে। অভিকের ভেতর যেন সব নদী শুকিয়ে গেল। পৃথিবী থেমে গেলেও নদীর স্রোত চলতে থাকে—কিন্তু সেই স্রোতে অভিক এখন কেবল শুনতে পায় একটাই শব্দ—
“আমি আছি তোমার ভেতরে, তোমার নদীর গভীরে।”
আজ বহু বছর পর অভিক আবার নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে। ঢেউয়ের শব্দে, বাতাসের গন্ধে, আকাশের মেঘে সে নিশিকে খুঁজে পায়। নদীর ঢেউ ভেঙে প্রতিধ্বনি হয়ে বাজে নিশির কণ্ঠস্বর।
অভিক চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে,
“তোমার আসাটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে প্রত্যাশিত আর অর্থবহ অলৌকিকতা। তুমি না থাকলেও, তুমি আমার স্রোতে আছো, নিশি।”
নদী যেন সেদিনের মতোই উত্তর দেয়,
“আমি আছি…”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।