প্রথমবার বাবার বুকে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আমার বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, যেদিন আমার ডিভোর্স হলো। প্রথমবার।
খবরটা শুনে বাবা প্রথমে কিছু বলেননি। শুধু চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম, এবারও হয়তো সেই পুরোনো কথাটাই শুনতে হবে—“কী করছিস জীবনে? একটা সংসারও টিকিয়ে রাখতে পারলি না?”
ছোটবেলা থেকে বাবার মুখে এমন কথা শুনেই বড় হয়েছি। পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে, চাকরির ইন্টারভিউ থেকে খালি হাতে ফিরলে, নিজের পছন্দে কিছু করতে গিয়ে ভুল করলে—বাবার প্রশ্ন একটাই ছিল, “কী করছিস জীবনে?”
বাবা আমাকে ভালোবাসতেন, কিন্তু তাঁর ভালোবাসা প্রকাশের ধরনটা ছিল অন্য রকম। আমি মন খারাপের কথা বলতে গেলে তিনি সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে সমাধান দিতেন। ভুল করলে বুঝিয়ে দিতেন, কোথায় ভুল করেছি। কখনো শুধু পাশে বসে থাকেননি।
বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস সব ঠিকই ছিল। তারপর ছোটখাটো কথা নিয়ে ঝগড়া, একে অন্যকে দোষ দেওয়া, আত্মীয়দের ফোন, বোঝাপড়ার নামে আরও কিছু অপমান। অনেক দিন চেষ্টা করেছি। কখনো নিজের কথা গিলে ফেলেছি, কখনো ভেবেছি, আরেকটু মানিয়ে নিলেই হয়তো সব ঠিক হবে।
শেষ পর্যন্ত যেদিন সম্পর্কটা কাগজে-কলমে শেষ হলো, সেদিন আদালতের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না।
বাড়ি ফেরার পথে মাকে ফোন করেছিলাম।
মা শুধু বলেছিলেন, “কোথায় আছিস? তাড়াতাড়ি আয়।”
বাবার কথা জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি।
বাড়িতে ঢুকতেই দেখলাম, বাবা বসার ঘরে বসে আছেন। সামনে খবরের কাগজ খোলা, কিন্তু তাঁর চোখ কাগজে নেই। আমাকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
আমি মাথা নিচু করে বললাম, “সব শেষ, বাবা।”
কথাটা বলেই চুপ করে গেলাম।
বাবা কোনো প্রশ্ন করলেন না।
আমার কাছে এসে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন।
আমি প্রথমে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাবার কাঁধে মাথা রাখার অভ্যাস আমার ছিল না। ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়ালে মা কোলে নিতেন, বাবা বলতেন, “কাঁদলে হবে? উঠে দাঁড়া।” বড় হওয়ার পর মন খারাপের কথা বলতে গেলে তিনি সমাধান দিতেন, সান্ত্বনা নয়।
সেই মানুষটাই সেদিন আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, “ঘরে আয়। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কথাটা শুনে বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাটা আর ধরে রাখতে পারলাম না।
আমি কাঁদছিলাম। বাবা আমাকে ছাড়েননি।
মা পাশে দাঁড়িয়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিলেন। কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি, আমি কেন সংসারটা বাঁচাতে পারলাম না। কেউ বলেনি, মানুষ কী বলবে। সেদিন দুপুরে মা আমার পছন্দের খাবার রান্না করেছিলেন। বাবা নিজের হাতে এক গ্লাস পানি এনে আমার সামনে রেখেছিলেন।
সন্ধ্যার দিকে বাবাকে বারান্দায় একা বসে থাকতে দেখলাম। পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, “খেয়েছিস?”
আমি মাথা নাড়লাম।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি আমার ওপর রাগ করোনি?”
বাবা আমার দিকে তাকালেন। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, “তুই কি ইচ্ছে করে কষ্ট পেতে গিয়েছিলি?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
বাবা আবার বললেন, “সবকিছু ঠিক রাখতে গিয়ে মানুষ কখনো কখনো নিজেই ভেঙে যায়। তুই বাড়ি ফিরেছিস, এটাই এখন বড় কথা।”
আমি বাবার পাশে বসে রইলাম। তাঁর হাতের ওপর আমার হাত রাখলাম। বাবা হাত সরিয়ে নিলেন না।
সেদিন রাতে নিজের পুরোনো ঘরে শুয়ে অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি। পাশের ঘর থেকে মা-বাবার নিচু স্বরে কথা বলার শব্দ আসছিল। কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম না। শুধু বুঝতে পারছিলাম, তাঁরা জেগে আছেন।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখলাম, দরজার পাশে চায়ের কাপ রাখা। বাবা বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। আমাকে দেখে বললেন, “চা ঠান্ডা হয়ে যাবে। খেয়ে নে।”
আমি কাপটা হাতে নিয়ে তাঁর পাশে বসলাম।
বাবা কাগজের পাতা উল্টে দিলেন। আমি চায়ে চুমুক দিলাম।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।